শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১১

বাসা বদল



 বারান্দার এককোনার জবা ফুলের গাছটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর অতনুর চোখ দিয়ে আপনা আপনিই কফোঁটা জল বেরিয়ে পড়ল। ফুলগাছটায় এখনও একটা ফুল বিকেলের সবটুকু আলোকে ম্লান করে দিয়ে হেসে হেসে এদিক ওদিক দুলছে। পরম মমতায় গাছটার গায়ে, পাতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে অনেক কথা বলে যায় সে। সেই কবে এক শীতের ছুটিতে ডিসি হিল পার্কের বাহাদুর নার্সারি থেকে ছোট্ট একটা চারা কিনে এনেছিল, রোগা গাছটা আজ বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে গ্রিলের বাইরে গিয়ে চড়ুই আর মৌমাছিদের সাথে খুনসুটি করে। প্রতিদিন ভোরে পাপড়ি মেলে দিয়ে লাল টকটকে সিঁদুরের মত ফুলগুলো তার সূর্যটার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অতনুর ভারী কষ্ট হয় যখন মনে পড়ে এ গাছটিকে এ বারান্দাতে রেখেই কাল ওদের চলে যেতে হবে নতুন বাসায়। কে আর ফুল গাছের জন্য অমন করে ভাববে, হলুদ পাতা সরিয়ে ফেলবে, ভেঙ্গে দেবে কুচক্রী পিঁপড়েদের বাসা? ফুলগুলিও কাকে দেখে বিকেলের মৃদু আলোয় হেসে হেসে কথা বলবে? আজ শেষ বিকেলটা তাই অতনু একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চায় লম্বা বারান্দাটায়।

কতগুলো বছর কাটিয়ে দিল ওরা ১৩ নম্বর আব্দুস সত্তার রোডের এই বাসাটায়। অতনু গুনেগুনে দেখল বিশ বছর। এ ঘরেই বেড়ে উঠেছে সে, কাটিয়েছে শৈশবের হাসিমাখা ঊচ্ছল দিনগুলি, যৌবনের সমস্ত আবেগ, সমস্ত সংরাগ, সমস্ত আগুন এঘরেই লুকিয়ে রেখেছে সে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল চেনে তার হাতের স্পর্শ, মুখস্থ হয়ে গেছে তার ওদের রং-রূপ-গন্ধ। কোন বিন্দুর উত্তাপ কেমন, কোথায় লুকোলে সারাদিনেও কেউ তার টিকিটি খুঁজে পাবেনা আর তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে উদবিগ্ন মা-বাবার কথোপকথন শুনতে পাবে জানা আছে তার। দুষ্টু চড়ুই মিটারের পেছনে ডিম পেড়ে রাখে, রান্নাঘরের কড়াই রাখার তৃতীয় থাকে আছে বহু পুরোনো একটা চৌকো পাঁচ পয়সার কয়েন যার গায়ে আঁকা আছে সুন্দর একটা লাঙ্গল, স্টোর রুমের শেষ মাথায় আছে ফাউন্টেন পেনে লেখা একটা হিসাবের পাতা আর দুটো ছোট ছোট দাঁত- এসব গোপন খবর জানবে কি আর কেউ কখনও? ফিকে হয়ে আসা আকাশটার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকে অতনু আর কিছুক্ষণ পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

গ্রাম থেকে শহরে আসার পর প্রথম ছমাস এদিক ওদিক কাটিয়ে সোজা এ বাসায় এসে শেকড় গেড়েছিল ওরা। অতনুর বয়স তখন কতই বা আর, নয় কি দশ। তিনতলার বাসাটি থেকে যেন পুরো শহরটাই দেখা যেত। চারপাশে তখন আজকের মত এত বিল্ডিং এর আগাছা ছিলনা। সামনে বিশাল খেলার মাঠ, মাঠের ভেতর গ্রিলে ঘেরা একটি ফুলের বাগান, ওতে ফুটে থাকে বাহারী সব ফুল, শিউলি, হাস্নাহেনা, জুঁই, গন্ধরাজ, বেলী। আরও ছিল ব্রোঞ্জ আর সাদা পাথরের কিছু মূর্তি যাদের নামগুলো তার কাছে তখনও ছিল অপরিচিত। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে বুড়ো বুড়ো কিছু মানুষ এসে ওদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পড়িয়ে দিত। খুব ভোরে অতনু ফুল পাড়তে গেলে বাগানের ভেতরের মূর্তিগুলোর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত। কী গনগনে দৃষ্টি সূর্যসেন নামের মূর্তিটির চোখে। বাবা বলত সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী মহান বিপ্লবী, চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিলেন চার দিন। বিপ্লবের মানে কি তখন আর সে বোঝে?

তখন আলো আর হাওয়াদের ছিল অবাধ আসা যাওয়া। রাস্তার মোটরের হর্ণের তীব্র আওয়াজে কান অভ্যস্ত হয়ে এলে ওসব ছাপিয়ে কেবল কানে বাজত শালিক, চড়ুই, দোয়েল, পায়রাদের শিষ। দক্ষিণদিকে সাবেকি আমলের বাংলো বাড়িটি ছিল অনিল বাবুদের। বুড়ো দাদু ভোরবেলা দেউরিতে বসে বসে রোদ পোয়াতেন আর প্রায় রাতেই গাইতেন একটা অদ্ভুত গান, নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচলভরা ফুল। শুনতে শুনতে অতনুর গানটা মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। ঘরের হারমোনিয়ামে সুরটা তুলতেও পারত। ও বাড়ির বিশাল আমগাছটার বেশ কিছু ডাল অতনুদের পূবের বারান্দা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাত বাড়ালেই আম্রপল্লব। প্রতিবছর আমের মৌসুম এলে অতনু দাদাদের সাথে মিলে বিভিন্ন কসরতে কাঁচা আম পেড়ে নিত বুড়ো দাদুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে। মাঝে মাঝে কোন একটা ডালে বাসা বাঁধত পাতিকাক, তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে পাখিটা তখন মানুষ হয়ে উঠত। ঠিক তার মাও গ্রামে ছোটবেলায় এমন করেই তার মুখে খাবার তুলে দিত। অতনু রোজ রোজ এসে দেখত বাচ্চাগুলো কতটুকু বাড়ল, তারপর একদিন দেখত একটা বাচ্চা অন্যটার চেয়ে  আলাদাভাবে ডাকছে, অনেকটা সুর করে করে। মা বলত, এটা কোকিলের ছা। কোকিল চুরি করে এসে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায়। মা কাকটা কিন্তু বাচ্চা দুটোর মুখেই খাবার পুরে দিত। অতনু ভাবতো কাকটা কী বোকা!

বুড়ো দাদুদের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটারা যখন কাজরী গাইতে গাইতে লাফিয়ে পড়ত, ওবাড়ির সুন্দর রেশমী দিদি আঙিনায় এসে বৃষ্টির জলে ভিজত। স্কুলে যেতে হবেনা আজ, ভিজে গেলে জ্বর হবে মা বলত, অথচ অতনু ভেবে পেতনা বৃষ্টির জল বড়দের কেন কাবু করতে পারেনা। সুন্দর রেশমী দিদির বিয়ের দিনে বাড়িটায় সে কি আলো, কত রঙ, সারারাত সানাইয়ের সুর। সন্ধ্যাকাশে একটা দুটো তারা চিকচিক করে উঠতেই সেকথা মনে পড়ে গেল তার।

উত্তরে বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল এনাম কাকুদের বাড়ি। এনাম কাকুর ছেলে টিটু আর মিঠুর সাথে অতনুর দাদাদের ভারি দোস্তি। ওদের সাথে সেও প্রায়ই ফুটবল খেলতে যেত সেখানে। কী বিশাল বাড়ি, সারি সারি সব নারকেল গাছ, একটা কাঁঠাল গাছের ডাল এসে খাবার ঘরের জানলাতে প্রায়ই উঁকি দিত। বাড়ি থেকে তাল এলে মা ঐ কাঁঠাল পাতাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে ওতে তালের রস আর চালের গুড়ো দিয়ে বানাত মজার একটা পিঠা। ও বাড়ির দারোয়ান খোরশেদ মিয়া অতনুদের বিল্ডিং এর দোতলার দিকে চেয়ে চেয়ে সিনেমার গান গাইত, আর বিশ্রী করে হাসত, আর হাত নেড়ে নেড়ে কাকে যেন কীসব বোঝাত। কমাস পর দোতলার কাজের মেয়েটা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়, কাকতালীয়ভাবে খোরশেদ মিয়াও। এ ঘটনার পর মা নিষেধ করে দেওয়ায় অতনুর এনাম কাকুদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বহু বছর পর একদিন খোরশেদ মিয়া আবার ঐ বাড়িতে ফিরে আসে, সাথে আসে ওর বউ, অতনুদের দোতলার কাজের মেয়ে বিউটি। একদিন একটা দূর্ঘটনা ঘটে। ফি-বছর গাছি এসে এনাম কাকুদের নারকেল পেড়ে দিয়ে যেত। ওরকমই কোন একবার নারকেল পাড়ার সময় ইয়া বড় এক নারকেল এসে পড়ে এক পথচারীর মাথায়। আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাওয়া ঐ লোকের ভাগ্যে পরে কী ঘটেছিল অতনুর তা জানা না থাকলেও এ ঘটনার পর এনাম কাকুদের নারকেল গাছগুলো রাস্তার পাশে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলে।

একটু একটু করে অন্ধকার নেমে এসে পূবের আকাশের কলাবতী ফুলের রংটুকুকে গ্রাস করে ফেলে, সেখানে টপটপ করে জ্বলে উঠে রূপালী সব তারা। একটা পুরনো কথা মনে পড়ে যায় ওর, মানুষ মরে গেলে তারা হয়ে যায়। পাড়ায় অতনুর ভাল দুজন বন্ধু ছিল, নিপুল আর রন। দুজনই আজ ঐ আকাশে তারা হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে। মাঠের এককোনে নিপুলের নিজহাতে লাগানো গাছগুলো আকাশ ছুঁইছুঁই করছে, গাছগুলো আছে অথচ ছেলেটা নেই। অতনুরও তো যাওয়ার কথা ছিল রনর বাবার মৃতদেহ নিয়ে ওদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার, শুধু পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে ফিরতে একটু যা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ওরা ওকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, আর পথেই সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা। মাইক্রোবাসটি উলটে গিয়ে আগুন ধরে গেলে জীবন্ত পুড়ে মরে গিয়েছিল ছেলেগুলি। শ্মশানে লাশগুলো চিনতেই পারেনি সে, চিনবে কীকরে, মানুষগুলো তখন সব কয়লা। ভাগ্য বড় নির্মম। কবছর বাদেই এই জানলা দিয়েই অতনু দেখেছে নিপুলের ছোট ভাইটির লাশও আসছে হিমাগারের গাড়ি করে ভোরের মাঠে।

লম্বা বারান্দায় গ্রিলের ছায়া পড়ে তেরছা হয়ে। এই বারান্দায় ও আর ইতু ক্রিকেট খেলতো দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত। ঠক, ঠক, ঠক শব্দে মুখর হয়ে যেত সারাটা দুপুর। এখনও জানলাটার কাঁচে ফাটলটা দেখা যায়, ইতুর ব্যাট জোরে গিয়ে লেগে চিড় ধরে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালা সেদিন এসে বাবাকে বেশ দুকথা শুনিয়ে দিয়েছিল। মেজদার বন্ধুরা এসেও হুল্লোড় করে বারান্দাটা মাথায় তুলে রাখতো মাঝে মাঝে। শনিবার সন্ধ্যায় মাঠ থেকে সোজা সবাই চলে আসত তিন বুদ্বুর হাসির সিরিয়াল দেখতে, তারপর সে কি হাসি, হাসির দমকে পুরো বাড়িটাই কেঁপে উঠতো। এখনও সে হাসির রেশটুকু টের পায় অতনু ঘরের এধারে ওধারে।

রবি-মঙ্গলবার বাবার গানের ক্লাস হত। এই এতগুলো বছরে বাবার কত ছাত্র-ছাত্রী এ বাসায় এল আর গেল। তাদের অনেকেই হয়ে গিয়েছিল এ বাসার খুব আপনজন। তাদের বিভিন্ন রাগের রেওয়াজের সুর মিশে আছে এ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে। লোডশডিং হলে গরমের দিনে চুপটি করে বারান্দায় গিয়ে মা শুনতেন ওদের গান, আর গুনগুনিয়ে ভাঁজতেন হয়তোবা ভূপালী অথবা মালকোষের কোন সুর। অতনুর সব মনে পড়ে যায়। এ ঘরেতেই তার পিতা বাইশটি শ্রুতির মায়াজালে পড়ে প্রবীণ থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন, এ ঘরেতেই তার চাঁদের মতন সুন্দর মার টানটান চামড়া একদিন হয়ে গেছে লোল। প্রতিবছর লক্ষীপূজোয় মা সুন্দর করে গুড়ো চালের রঙ দিয়ে নকশা আঁকতেন দুয়ারে, কালীপূজোর রাতে ওরা সব ভাইয়েরা মিলে জানালায় জানালায় বাতি জ্বালিয়ে পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত জোনাকীর রুপে সাজাতো, নতুন বছরের প্রথম দিনে এ ঘরের প্রতিটি দরোজায় বিহু ফুলের মালা টাঙিয়ে দিত ওরা।স্মৃতির সুর আজ বড় করুণ হয়ে বাজে অতনুর কানে। সবকিছু বাঁধাছাদা হয়ে গেছে, কাল ভোরে এসে মালপত্র নিয়ে যাবে ভাড়া করা লোকজন, রাস্তা দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে অতনু। বুড়ো দাদু মরে গেল, ওরাও একদিন বাড়িটা বেচে দিয়ে চলে গেল, নতুন বাড়ি উঠতে সময় বেশীদিন লাগলোনা। দক্ষিণ দিকে এগারতলার বিশাল দালানটা পুরো বারান্দাটার একাংশ ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখে সারাবেলা। যেদিন ওরা আমগাছটা কেটে ফেলছিল সেদিন অতনুর বুক ফেটে কান্না পেয়েছিল। আমগাছের কাকের নতুন বাসায় তখন দুটো ছোট ছোট ছা। এখন সাদা বাড়িটার একটা খোপে দুটো লক্ষীপেঁচা সারারাত চিৎকার করে ডাকে। মাঝে মাঝে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে চড়ুইয়ের বাসায় আক্রমণ চালায় ওরা। উত্তরদিকে এনাম কাকুদের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায়ও ঢ্যাঙা একটা বিল্ডিং উঠে গেছে। খাবার ঘরে এখন উঁকি মারে ও বাড়ির ছোট্ট অন্তু। কোথাও কোন শালিক নেই, দোয়েল নেই। সামনের মাঠের বাগানে একটাও ফুলের গাছ নেই আর। সূর্যসেনের চাহনিতেও সেই জ্যোতি আর দেখেনা অতনু। বালির মাঠটায় যখন জোর বৃষ্টি হত, তখন নদীর মত ধারা হয়ে জলের রেখা ছুটে যেত বড় নালার দিকে। সে মাঠটাকে ঢেকে ফেলা হয়েছে কনক্রীটের চাদরে। বিকেলে কেউ আর ঘুড়ি ওড়াতে আসেনা আর আজ।

আজ রাতে ঘরটা হুহু করে হয়তো কেঁদে উঠবে। দেয়ালগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়বে মালকোষ আর ভূপালীর সুরেরা। পাঁচ পয়সার আত্মা হয়ত জেগে উঠে বলবে আমাকে ফেলে রেখে চলে যেওনা। বিশটা বছরের স্মৃতি রেখে কাল ভোর হলেই অতনুরা চলে যাবে নতুন বাসায়। তারপর নীচ দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।








আয়োলের গান


আয়োলের গান
-          মারি ফেলিসিতে ইবোকেয়া।


রাগে ফুঁসতে থাকা মহিলা জুতোর হিল দিয়ে যেভাবে মাটি দাবড়ায়, পৃথিবীটাকে ঠিক ওরকমভাবেই পেটাতে থাকা গনগনে সূর্যের নীচে মাথায় বোঝা চাপিয়ে আয়োলে অতিকষ্টে তার কুঁড়ের দিকে চলে যাওয়া পথটি ধরে এগোচ্ছিল। একবার মুহুর্তের জন্য থেমে সে নিঃশ্বাস নিল। একহাত দিয়ে মাথার উপরে থাকা কলসটিকে সামলিয়ে, অন্য হাতটি গোলাকার পেটের উপর রেখে দ্রুত একটা শুকনো বাতাস এক নিঃশ্বাসে বুকে টেনে নিল সে।

যখন থেকে মরুভূমি চারপাশটাকে গিলে নিতে নিতে এগোনো শুরু করেছিল, সে অনেক দিন আগের কথা, তখন থেকেই আয়ালের গ্রামে পানির অভাব। সেইসব মহিলারা, প্রকৃতিই যাদের এখানে ফেলে রেখে গেছে পুরুষেরা নয়, অন্য যেকোন কারো চেয়ে খুব ভাল করেই জানেন এই দূর্লভ বস্তুটির কী মূল্য। বাওবাব গাছের ছায়ায় বসা মুরুব্বিদের ভয়াবহ পঞ্চায়েত সভাটির পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে ঐ সময়ের পর থেকে মহিলারা গ্রামের বাইরে গিয়ে সন্তান প্রসব করবে এবং নবজাত শিশু পায়ে হাঁটা শুরু করার আগ পর্যন্ত তারা আর গ্রামে ফিরে আসবে না।

গলায় উঠে আসা বমির ভাবটাকে দমন করে আয়োলে চেষ্টা করল দুঃশ্চিন্তার ভারটাকে একটু হাল্কা করতে যা তার ভ্রুণশিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। আর মাত্র কদিন পরের অনিবার্য যাত্রাটির কথা মনে করেই কিনা কে জানে, উপযুক্ত সে ক্ষণটির জন্য অপেক্ষমাণ বাচ্চাটি নড়েচড়ে উঠল এবং ফুলে ফেঁপে উঠে শেষ সীমানায় চলে যাওয়া পেটের চামড়া যে সুরক্ষা-তাঁবু তৈরী করেছে সেটিকে উলটে পালটে দিল।

যার জন্য আয়োলের হৃদয় সব-সময় নেচে উঠত সেই মানিলে অনেক দিন আগে শহরে পালিয়ে গিয়েছিল পাগুলো তাকে যতটুকু দ্রুতবেগে চলার শক্তি দিয়েছিল তার সবটুকু দিয়েই। আয়োলে তার পিছু পিছু যেতে চায়নি। মানিলে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিল, হরিণী আমার, যথেষ্ঠ শক্তি কী নেই তোমার!

নীচু ছাদের একটা কুঁড়ের সামনে এসে আয়োলে মাথা থেকে তার সারা দিনের রসদ পানির কলসটি নামাল। মৃদু গোঙানির শব্দ পেয়ে ছোট ভাই আয়োলেলা দ্রুত তার কাছে ছুটে এল।

আজ সকালে আমার বোনটি কেমন আছে? তোমার গুনগুনানি আমাকে তোমার ঘরে ফেরার বার্তা জানিয়েছে আর তোমার জন্য আমি এটা নিয়ে এসেছি। ভাঁজ করা আর আঠা দিয়ে দুইপ্রান্ত জুড়ে দেয়া একটা কাগজের টুকরো সে আয়োলেকে দিল। চিঠি! একটা অদম্য শিহরণ বুকটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল তার।

ভয়ের কিছু নেই, আমার মনে হয়, এটা মানিলের কাছ থেকে এসেছে।

ভারী শরীরটাকে নরম মাদুরের উপর রেখে আয়োলে স্কার্টের কোনা দিয়ে আনমনে কপাল মুছল। তারপর ভাঁজ করা কাগজটা ছুঁয়ে দেখল, দুইদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিল এবং শেষে তার ভাইকে আবার সেটি ফিরিয়ে দিল।

নাও, খোল এটা আর যদি খারাপ কিছু থাকে তবে আমাকে বোলনা।

এবার আয়োলেলার পালা এল চিঠিটা ভাল করে পরখ করার। এটা অনেক দূর থেকে এসেছে। ঘোষণা করল সে। কাগজটা বেশ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ও, তারপর একটু মুচড়ে নিয়ে কয়েকটা জায়গাকে চিহ্নিত করল। শোন তবে...

হরিণী আমার,
আশা করছি যে তোমার শরীরের ভার খুব বেশী হয়ে পড়েনি। মুরুব্বিদের আইনে শুধুমাত্র বুড়ো সিংহগুলোই টিকে থাকবে, একবার তারা সব অল্পবয়সী বুনো পশুগুলোর অপরিপক্ক দাঁতগুলো উপড়ে ফেলতে পারলেই হল। প্রিয় আয়োলে, তোমার বাহুযুগল, যারা জানে কীকরে একজন পুরুষের স্বপ্নকে ধারন করতে হয়, সাকার করতে হয়; তাদের কাছ থেকে হঠাৎ করেই দূরে সরে আসার জন্য আমাকে তুমি ক্ষমা করো। সুন্দরী আমার, প্রিয়তমা, ওরা যেভাবে শহরটাকে এঁকেছে ছবিতে আদতে এর ক্যানভাস অমনটি নয়। মাতিকিন তোমার মতন একজন তরুনীকেই চায়। এখানে আমরা সৌভাগ্য রচনা করব। আমি বৃদ্ধ রাজা সাপিতিয়ের সাথে কথা বলেছি। তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এবং আমাদের অনাগত সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার পূর্বে ভেবে দেখ, আমাদের আর বাচ্চাটার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা কোরো। তবে বেশী সময় নিওনা। মহামহিম এখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর, অরাজকতাই রাজত্ব করবে এবং আমার জেলে যাওয়া বা আরো খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনাও আছে। প্রতিবার চাঁদ যখন পাহাড়ের উপর ওঠে আমি তোমার কথা ভাবি। কল্পনায় দেখি তোমার সোহাগ কিভাবে আমার রাতগুলোকে আনন্দদায়ক করে তুলছে, তোমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকে জিভের তলায় যে তিক্তটা টের পেয়েছি সেটার প্রশমনকারী মধুর চেয়ে ঢের বেশী আনন্দদায়ক তোমার ঐ ভালবাসার ছোঁয়া।
                                                                            তোমার মানিলে, তোমার সন্তানের পিতা।

আয়োলেলা কাগজটি ভাঁজ করে তার বোনের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

সে ভাল করেই জানে যে আমি যাব না। এখানেই আমার পূর্বপুরুষেরা বাস করেছেন, এটিই আমার গল্পের এবং আমার অনাগত সন্তানের জায়গা।

আয়োলে পা ছড়িয়ে দিয়ে বসল। তার চোখ গিয়ে পড়ল ভাইয়ের চোখের উপর।
তাছাড়া, সময় হয়েছে নদীর পাড়ের রাস্তা ধরবার। একটা স্বপ্নালু অভিব্যাক্তি মুখে রেখে পেটের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল সে।

কয়েক দিন পর, আয়োলে আর তার ভাই বিশাল বনটিতে একটিতে জায়গা বেছে নিল তাদের অস্থায়ী ঘর তৈরীর জন্য। ছোট্ট একটা জলাশয়ের কিনারে একটা জায়গা তাদের মনে ধরল যেখানে কিছু বৃক্ষ মিলে একটা গম্বুজের আকার ধারন করেছে। আয়োলের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন দ্রুততর হয়েছে, তাই প্রসব হওয়ার আগে তারা দুজন কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তরুনী আয়োলে সারাদিন গান গাইত আর রাতে ছোট ভাইটিকে শোনাত দারুণ সব গল্প। সে বেশ ওয়াকিবহাল যে আয়োলেলা এখনও ছোট একটা ছেলে যে বোনের প্রতি নিবেদিত-প্রাণা এবং বোনের পাশে থাকতে রাজী থেকে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে।

বড় বড় গাছগুলোর পেছনে চাঁদের আলোর অনুপস্থিতি বনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিকে আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষ রাতের দিকে আয়োলে দুটি শিশুর জন্ম দিল। পুঁচকে মেয়েটা, যার নাম মিনা্লে, সারা রাতভর চেঁচাল। একরত্তির ছেলেটা, হোহোলা যার নাম, মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল আর মিটিমিটি হেসে যেন চিরন্তন ভালবাসার ঘোষনা করে যাচ্ছিল। দুজনের প্রত্যেকেই মায়ের একটি করে স্তনে আঁকড়ে পড়ে থাকল আর লোভীর মতই দুধ খেয়ে যাচ্ছিল। তাদের মা পরিষ্কার পানিভর্তি একটা কলসের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আয়োলেলা মাছ ধরতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল।

দিনগুলো কেবল যায় আর আসে, চাঁদটাও কেবল উঠে আর ডুবে যায়; আর শিশু দুটি একটু একটু করে বড় হতে লাগল। তাদের কাছে জঙ্গলটি বিশাল এক খেলার মাঠ। যখন তাদের মা ব্যস্ত থাকত, মামা তাদের তুলে নিয়ে দীর্ঘ হাঁটার পথে নিয়ে যেত। তারা চিনতে শিখতে লাগল অপেক্ষাকৃত কম হিংস্র পশুগুলোকে। সন্ধ্যাগুলোয় আয়োলে গাইত তার গান আর বাচ্চাদের জন্য বুনত গল্পের জাল।

এক ভাগ্যবিড়ম্বিত দিনে, ছোট্ট মিনালে সাহস করে নদীতে নামতে গেল। একরত্তির ছেলেটা তখন হাত আর পায়ের উপর দিয়ে ভর দিয়ে মায়ের চারপাশে হামাগুড়ি দিচ্ছিল। হঠাৎ মিনালে চিৎকার করে উঠল আর আয়োলের হাত থেকে সাথে সাথেই যে খাবারটা সে কলাপাতায় মুড়ে রাখতে যাচ্ছিল সেটি মাটিতে পড়ে গেল। আয়োলা যখন কাদাময় নদীটির দিকে ছুট লাগাল; ভীত, সন্ত্রস্ত্র হোহোলা তার মায়ের পা আঁকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করল। যখন আয়োলা সেখানে গিয়ে পৌঁছাল, তখন কেবল অসহায়ের মত তাকিয়ে সে দেখল, ঘোড়ার পিঠে সওয়ার তিনজন লোক তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, সাথে নিয়ে যাচ্ছে চিরজীবনের মত তার কান্না আর আর্তনাদকেও।

বিশ বছর পরের কথা। ছোট্ট মিনালে মাতিকিনের রাণী হয়ে গেছে ততদিনে আর সবকিছুর উপর তার জন্মেছে তীব্র বিতৃষ্ণা। তার স্বামী, বৃদ্ধ রাজার মৃত্যুতে কয়েক মাস ব্যাপী চলা ভাতৃঘাতী যুদ্ধের পর শান্তি ফিরে এসেছে আবার। মিনালে একটা সু্রের শিষ কাটল যেটা সবসময় তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আর দুঃখের মুহুর্তগুলোতে যেটি প্রায়ই তার জিভ ছুঁইয়ে যায়।

এখনও পর্যন্ত কেউই এই সুরের উপর কথা বসাতে পারেনি। প্রতিবছর মিনালে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করত যা দলে দলে আকৃষ্ট করত গল্পবলিয়েদের। কিন্তু আজ অবধি কেউ খুঁজে পেলনা সেই কথামালা যা রাণীকে খুশি করতে পা্রে। মিনালে তার বিশাল বৈঠকখানার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল। কেন সে তার বংশপরিচয় সম্পর্কে বেশী কিছু জানল না? সে জানে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার এই জানার তৃষ্ণা মিটছে, নিজের ভেতরে সে শান্তি খুঁজে পাবেনা। সে নিশ্চিত যে এই রহস্যের চাবিকাঠি পাওয়া যাবে সেই গানেই যার জন্য উপযুক্ত কথামালা এখনো অবধি কেউ তার কাছে নিয়ে আসতে পারেনি। রাজা সাপিতিয়ের মৃত্যুর পর থেকে, সে কিছু তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যা রাজা তার কাছে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু সে চায় আরো বেশী করে জানতে।

দরজার উপর ছোট্ট একটা টোকা পড়ল যা কাছের বাগানগুলোতে এতক্ষণ ধরে বিরাজ করতে থাকা সুরের ছন্দপতন ঘটাল।

ভাঙা গলায় মিনালে গর্জে উঠল, কার এমন সাহস এ অসময়ে দরজার কড়া নাড়ে?

আমি আপনার বিদূষক, রাণীমা।

ব্যাপার কী মানিলে?

এখানে একজন বন্দী আছে যে তার কলা প্রদর্শণের পূর্বে আপনার সাথে দেখা করার অনুমতি চায়। একজন গায়ক যে কিনা...

ঠিক আছে, ওকে আসতে দিন।

যথা আজ্ঞা মহারাণী

সাদা কাপড় পরিহিত ধূসর চুলের মানিলে দরজা দুটি খুলে দিয়ে শীর্ণ কাপড়ে ঢাকা তরুনটিকে ঢুকতে দেবার জন্য একটু সরে দাঁড়াল। এ আর কেউ নয়, হোহোলা, খালি পা তার, হাড়জিরজিরে গলায় ঝুলছে অদ্ভুত একটা বাদ্যযন্ত্র। মানিলে বিস্ফারিত নেত্রে ঘরে প্রবেশ করতে থাকা এই ভবঘুরের দিকে তাকিয়ে থাকল, তার নিজের ভয়ার্ত চেহারারই অবিকল প্রতিচ্ছায়া, শুধু বয়সে সে অনেক নবীণ। আপন নিয়তি সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আলতো করে সে দরজাটা বন্ধ করল। গতায়ু রাজা সাপিতিয়ের রাজকাজ্যে আসার পর সে রাজার আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। আয়োলেলার কাছ থেকে তাদের অস্থায়ী ঘরের অবস্থানটি জানার পর সে নিজেই তার পরিবারের অপহরণের পরিকল্পনাটি তৈরী করেছিল। ঐ তিনজন লোককে সে বিদায় জানিয়েছিল এটা বিশ্বাস করে যে ওরা তাদের সঙ্গে করে আয়োলে, তার ভাই আর শিশু দুটিকে নিয়ে আসবে। উত্তেজনা তার চরমে পৌঁছেছিল যখন সে কল্পনায় দেখল আয়োলের গায়ের সুবাস আবার নিতে পারছে। তারপর, রাজপ্রাসাদের বারান্দায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া এক রাজকুমারের কাছ থেকে সে রাজার আসল অভিসন্ধির কথা জানতে পারে- শুধুমাত্র ছোট্ট মিনালের ব্যাপারেই সাপিতিয়ে যত আগ্রহ। ঘোড়সওয়ারদের উপর দায়িত্ব ন্যাস্তই ছিল শুধু মেয়েটিকে এনে দেওয়া। তারা মানুষজন নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারত।

সেদিনের পর থেকে, মানিলে কখনোই তার অপরাধবোধকে শান্ত করতে পারেনি। এটা স্বীকার করতেই হয় যে, রাজা তাকে সারাজীবনের জন্য উপদেষ্টা এবং বিদূষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন ভবিষ্যৎ রাণীর সেবাযত্নের জন্যই এবং আয়োলের মৃত্যুর পর যখন আয়োলা এসেছিল, রাণীর প্রধান পাচক হিসেবে তৎক্ষণাৎ তার চাকরী হয়ে গিয়েছিল। একদিকে যেমন সে শোকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে তার একটা ধারণা জন্মেছিল যে আয়োলের কাছে জমে থাকা ঋণ সে অংশত পরিশোধ করতে পেরেছে। আজ সে প্রথমবারের মত নিজের সন্তানকে দেখল এবং তার মনে হল যেন সে তার স্মৃতির সাথে, তার কাহিনীর সাথে, তার অতীতের সাথে এমনকি তার উচ্চাভিলাষের সাথে সমঝোতা করতে চলেছে। এতগুলো বছরের পর, রাণীমা অবশেষে জানতে চলেছেন সেই তাঁর প্রকৃত পিতা।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথচ গর্বোন্নত আয়োলে নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করল। মানিলে সুচতুরভাবে তাকে ঘরের কোনায় তার কাছে আসার জন্য ইশারা করল যেখানে তাকে দেখা যাচ্ছিল না।

সময় হয়েছে রাণীমার কাছে সত্যটা উন্মোচন করে দেওয়ার। আয়োলের কানে চুপে চুপে বলল মানিলে। সবগুলো ঘটনা একটাই পরিনতির দিকে এগুচ্ছে। ভাইবোনের অবশ্যম্ভাবী মিলন এখন আর কেউই ঠেকাতে পারবেনা। যা করার তা আমাদের খুব দ্রুত করতে হবে, রাজপুত্ররা এরিমধ্যেই ফোঁসফাঁস করা শুরু করেছে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারটা আমি তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি মানিলে। আমার চেয়ে ক্ষমতার ব্যাপারটা তুমিই অনেক ভাল বোঝ, কিন্তু রাণীমাকে জানাতে ভুলোনা যে তাঁর মামা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। শুধু ওদের মার মৃত্যুই আমাকে তোমাকে খুঁজে বের করতে ঠেলে দিয়েছিল আর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁকে।

কিছুক্ষণ পর, মানিলের সাথে কয়েকজন ক্রুদ্ধ ব্যক্তির দেখা হল যারা তক্ষুণিই রাণীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছিল। এইসব অল্পবয়সী রাজকুমারেরা, খুব বেশী অল্পবয়সীও আর নয় তারা, এইমাত্র দেখল যে রাণী, তাদের রাণীমা তাঁর নিজের কক্ষে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত লোককে ঢুকতে দিয়েছে। কিছু বলার জন্য মানিলে তার মুখ খুলল কিন্তু তারা কোনকিছুই শুনতে চাচ্ছিল না। রাজপুত্রদের থামানোর জন্য মানিলে সিদ্ধান্ত নিল তার গল্পটা ওদের সে বলবে। সে তাদের বলল যে রাণী আসলে তারই মেয়ে। যমজ সন্তান দুটির প্রথম জন্মদিনের আগেই একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পুনরায় একত্রিত হওয়ার কাহিনী সে ওদের কাছে উন্মোচণ করে দিল। সে তাদের কথা দিল যে রাণী অবশেষে শান্ত হবেন আর তাদের মধ্য থেকেই যেকোন একজনকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন। সে ভবিষ্যৎবাণী করল যে মাতিকিন এক নতুন শক্তি অধিকারী হবে।

মানিলের গল্প শেষ হওয়া মাত্রই, প্রাসাদের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ গান ভেসে এল। তাদের রাণীমার কণ্ঠ, সুরেলা এবং পরিষ্কার, তার সঙ্গে আর একটা বিষন্ন, চেরা কণ্ঠ, বন্ধ দরজার ওপাশের নীরবতা ভেঙ্গে দিল। সূর্যের আলোয় যেমন করে বৃষ্টির ফোঁটারা নাচে, ঠিক তেমনি স্বর্গীয় এ সঙ্গীত লোকজনকে প্রাসাদের দিকে আকৃষ্ট করে নিয়ে গেল। ইত্যবসরে, বহুদূরের গ্রামে যেখানে আয়োলে মাটির নীচে ঘুমিয়ে আছে সেখানে বৃষ্টির তীব্র একটা ধারা মুরুব্বিদের তাদের বাওবাব গাছের তলা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। যখন কানে তালা লাগিয়ে দেওয়া বজ্রধ্বনি সমস্ত গ্রামটাকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল, তারা মনে মনে বলল, ঈশ্বর, আমাদের মার্জনা করুন। আমাদের সভা বসাতে হবে। মহিলাদের সন্তান জন্ম দান করার নিমিত্তে আর কোনদিন গ্রামের বাইরে পাঠানো হবেনা।

আয়োলের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল।