রবিবার, ১ জুলাই, ২০১২


                                 তোবা টেক সিং
-          সাদাত হাসান মান্টো

১৯৪৭ এর দেশবিভাগের দুই কি তিন বছর পর, হঠাৎ কী জানি কী খেয়াল হল ভারত আর পাকিস্তান সরকারের, ঠিক হল যেভাবে অপরাধীদের এদেশ থেকে ওদেশে স্থানান্তর করা হয়েছিল ঠিক তেমন করেই বিনিময় করা হবে দুদেশের মানসিক ব্যধিগ্রস্থ লোকেদের। ভারতের মুসলিম পাগলদের পাঠানো হবে পাকিস্তানে আর পাকিস্তা্নি পাগলাগারদের হিন্দু-শিখ পাগলদের হস্তান্তর করা হবে ভারতের কাছে।
এহেন প্রস্তাবের আদৌ কোন গুরুত্ব ছিল কিনা বলাটা মুস্কিল। যাহোক, দুপক্ষের উঁচুপর্যায় থেকেই সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছিল। উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে একটা দিন ধার্য করা হল পাগলদের স্থানান্তরের জন্য। মোটামুটি দুপক্ষই সম্মত হল যে যেসব মুসলিমদের ভারতে পরিবার রয়ে গেছে তাদের ভারতে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হবে আর বাদবাকী সবাইকে সীমান্ত পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছে দেয়া হবে। যেহেতু প্রায় অধিকাংশ হিন্দু আর শিখই পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পাড়ি দিয়েছিল, অমুসলিম পাগলদের পাকিস্তানে রাখার ব্যাপারে তাই কোন প্রশ্ন উঠেনি। সবাইকেই ভারতে নিয়ে যাওয়াটাই তাই স্থির হল।
ভারতে এই ঘটনার জের কী হল তা কেউ জানলনা, কিন্তু খবরটা পাকিস্তানে, বিশেষ করে লাহোরের পাগলাগারদে বেশ শোরগোল তুলল যার ফলে উদ্ভূত হয়েছিল মজার কিছু পরিস্থিতির। এক মুসলিম পাগল, যে কিনা রোজ পড়ত জ্বালাময়ী উর্দু পত্রিকা দৈনিক জমিদার, পাকিস্তান কী এটা জিজ্ঞেস করায় একটু ভেবে নিয়ে বলেছিল, এটাও জাননা? পাকিস্তান হল ভারতের একটা জায়গা যেটি গলা-কাটার ক্ষুর তৈরীর জন্য খুব বিখ্যাত। উত্তরে মোটামুটি সন্তুষ্ট হয়ে বন্ধুটি তাকে আর কোন প্রশ্ন করলনা।
একই রকম ভাবে, এক শিখ পাগল আরেক শিখকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা সর্দারজি, আমাদের ভারতে পাঠিয়ে দিচ্ছে কেন এরা? আমরা তো ওদের ভাষাটাও জানিনা। বিজ্ঞের মত হেসে সর্দারজি বলল, আমি কিন্তু হিন্দোস্তোরাজ ভাষাটা জানি, হারামী ইন্ডিয়ানগুলো, হাঁটে এমনভাবে যেন তারা রাজা-উজির।
একদিন গোসল করার সময় এক মুসলিম পাগল এমন তারস্বরে পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে চিৎকার করে উঠে যে সে পিছলে গিয়ে মেঝেতে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
পাগলাগারদের সবাই যে পাগল ছিল অমন নয়। কয়েকটা দাগী খুনীও ছিল তাদের মধ্যে। ফাঁসীর রশি থেকে এদের বাঁচানোর জন্য তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা কর্মকর্তাদের ভাল-মতন ঘুষ দিয়ে তাদের এখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। ভারত বিভাগ কিংবা পাকিস্তান আসলে কী এসব নিয়ে তাদের কেবল ভাসা ভাসা কিছু ধারণা ছিল মাত্র। হালের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা পুরোপুরিই অজ্ঞ ছিল। পত্রিকাগুলোতে বলতে গেলে কোন সত্যি খবরই পাওয়া যেতনা আর পাগলাগারদের কর্মচারীরা ছিল অশিক্ষিত যাদের আলাপচারিতা থেকে তারা কোন কিছুর আভাসও পেতনা। এই লোকগুলো শুধু যা জানত তা হল কায়েদে আজম নামের এক লোক মুসলিমদের জন্য একটা আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছে যার নাম পাকিস্তান। কিন্তু এই পাকিস্তান যে ঠিক কোথায় এ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিলনা। আর এ কারণেই তারা ঠিক এই মুহূর্তে ভারতে না পাকিস্তানে আছে এ বিষয়টি নিয়ে ধন্ধে পড়ে গেল। যদি তাদের অবস্থান ভারতে্র মধ্যে হয়ে থাকে তবে পাকিস্তানটা কোন জায়গায়?আর যদি তারা এখন পাকিস্তানের ভাগে পড়ে, তবে এ কীকরে সম্ভব যে একটু আগেও তারা ভারতে ছিল? কীকরেই বা একটু আগে তারা ভারতের ছিল, আর কীকরেই বা হঠাৎ করে তারা পাকিস্তানের হয়ে গেল?
এই ভারত-পাকিস্তান-পাকিস্তান-ভারতের অর্থহীন শব্দ-শব্দ খেলায় এক পাগল এমন হতবুদ্ধি হয়ে গেল যে একদিন মেঝে ঝাড়ু দেয়ার সময় সে একটা গাছে চড়ে বসল এবং একটা ডালে বসে দুই ঘন্টা ধরে নীচের লোকগুলোকে ভারত-পাকিস্তানের স্পর্শকাতর সমস্যাগুলো সম্পর্কে উত্তেজিতভাবে বোঝাতে লাগল। যখন প্রহরীরা তাকে নেমে আসার জন্য অনুরোধ করতে লাগল, সে আরও আরও উঁচুতে উঠে গিয়ে বলল, আমি ভারতে বা পাকিস্তানে কোথাও থাকতে চাইনা। এইখানে, গাছের ঠিক এই জায়গাটাতে আমি আমার ঘর বানিয়ে থাকব।
এইসব হট্টগোল এক এমএসসি ডিগ্রিধারী শান্তশিষ্ট মুসলিম রেডিও-ইঞ্জিনিয়ারকে, যিনি কিনা আপনমনে দীর্ঘপথ হেঁটে বেড়াতেন, বেশ বিচলিত করে তুলল। একদিন তিনি তার সমস্ত কাপড় চোপড় খুলে উদোম হয়ে গেলেন, তারপর জামা-কাপড়গুলো সব এক প্রহরীকে দিয়ে বাগানের ভেতরে ঐরকম অবস্থাতেই দৌঁড়াতে লাগলেন।
চিনিয়টের আরেকজন মুসলিম উন্মাদ, কদিন আগেও যে কিনা একজন ঘোরতর মুসলিম লীগার ছিল আর দিনে পনের-ষোলবার গোসল করত, হঠাৎ করেই গোসল করা বন্ধ করে দিল। যেহেতু তার নাম ছিল মোহাম্মদ আলী, একদিন সে ঘোষণা করে বসল যে সে আসলে অন্য কেউ না, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহই। তারই পথ অনুসরণ করে এক শিখ একদিন বলে বসল, সে হল শিখদের মহান নেতা মাস্টার তারা সিং। ব্যাপারটা হয়ত একটা ভয়াবহ সংঘর্ষের দিকেই এগিয়ে যেত। কিন্তু কোনরকম ক্ষতি হওয়ার আগেই এই পাগল দুটোকে বিপদজনক ঘোষণা করা হল আর আলাদা দুটো সেলে বন্দী করে রাখা হল।
পাগলাগারদের উন্মাদদের মধ্যে লাহোরের এক হিন্দু আইনজীবি ছিল যিনি প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। যখন তিনি জানলেন যে অমৃতসর, যেখানে তার প্রেমিকাটির বাস, ভারতে পড়েছে তখন তিনি খুব দুঃখ পেলেন। হিন্দু আর মুসলিম সব নেতারা যারা ষড়যন্ত্র করে ভারতবর্ষকে দুইভাগ করেছে আর সেই সাথে তার প্রেমিকাকে ভারতীয় আর তাকে পাকিস্তানি বানিয়েছে, তিনি সেইসব নেতাদের বাবা-মায়ের নামে বিশ্রী গালাগাল দিলেন। যখন উন্মাদ বিনিময়ের এই কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়ে গেল, তখন তার পাগল বন্ধুরা তাকে উৎফুল্ল হতে বলল যেহেতু এখন তিনি ভারতে যেতে পারবেন। কিন্তু এই তরুণ আইনজীবিটি লাহোর ছেড়ে যেতে চাইলনা, কারণ অমৃতসরে তার আইনব্যবসার পসার নিয়ে তার মনে ভয় ঢুকে গিয়েছিল।
পাগলাগারদের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডে দুজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ছিল। যখন তাদের জানানো হল যে ব্রিটিশরাজ ভারতবর্ষ থেকে পাততারি গুটাচ্ছে, তারা ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা করতে লাগল যে সব সমস্যার তাদের সম্মুখীন হতে হবে সেসব নিয়ে। যেমন, ইউরোপিয়ান ওয়ার্ড কি নির্মূল করে দেয়া হবে? তারা কি সকালের নাশতা পাবে তখন? রুটির বদলে তাদের কি ভারতীয় একদম ক্ষুদ্রাকৃতির চাপাতি দিয়েই চালাতে হবে?
তাদের মাঝে একজন শিখ ছিল যাকে এই পাগলাগারদে পনের বছর আগে ভর্তি করানো হয়েছিল। যখনই সে কোন কথা বলত, সেটা ছিল দূর্বোধ্য রহস্যময় শব্দমালা-গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি লালটেইন এর মুগডাল। প্রহরীরা বলত যে সে এই পনের বছরে কখনও দুচোখের পাতা বন্ধ করেনি। এমনকি সে বিশ্রাম নেবার জন্য শোয়ও নি কোনদিন। এই অব্যাহত দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তার পাগুলো ফুলে গিয়েছিল আর পায়ের গোড়ালীর মাংশপেশির মাঝখানটা চুপসে গিয়েছিল, কিন্তু এরকম যন্ত্রণা সত্ত্বেও সে কখনও শোয়ার ব্যাপারটা নিয়ে গা করেনি। মুগ্ধচিত্তে খুব মনোযোগ দিয়ে সে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এই উন্মাদ বিনিময়ের সব আলোচনা শুনত। কেউ যদি এ ব্যাপারে তার মত জানতে চাইত, সে গলায় একটা বেশ ভারিক্কি ভাব এনে বলত, -গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি পাকিস্তান সরকারের মুগডাল। কিন্তু পরে সে পাকিস্তান সরকারের জায়গায় বলত শুধু তোবাক টেক সিং যেটি ছিল তার নিজের শহরের নাম। তখন সে জিজ্ঞেস করতে লাগল তোবাক টেক সিং কোন পক্ষে পড়বে। কিন্তু কাউকেই মনে হলনা যে এই প্রশ্নের উত্তর জানে। যারা ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিল তারা নিজেরাই আর একটা ধাঁধার পাঁকে আটকে যেতে লাগল। শিয়ালকোট আগে ছিল ভারতের, এখন হয়ে গেছে পাকিস্তানের। ঠিক একইভাবে, মনে হল লাহোর, যেটি আগে ছিল পাকিস্তানের, এখন হাত বদল হয়ে যাবে ভারতের। হয়ত পুরো ভারতবর্ষটাই হয়ে যাবে পাকিস্তান। সবগুলো ব্যাপার ছিল এমনই বিভ্রান্তিকর! আর কেই বা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে ভারত কিংবা পাকিস্তান দুটো দেশই পৃথিবীর বুক থেকে একদিন একেবারে অদৃশ্য হয়ে যাবেনা?
সিংজির পাগলাটে মাথার চুল কমে গিয়েছিল, দাড়ি হয়ে এসেছিল ধূসর বর্ণের, যার কারণে তাকে দেখাত বুনো আর হিংস্র। কিন্তু আদতে তিনি ছিলেন একেবারেই নিরীহ। পনের বছরে একবারের জন্যও কারো সাথে তার ঝগড়া হয়নি। পাগলাগারদের পুরোনো কর্মচারীরা জানত যে একসময় তিনি ছিলেন বেশ ধনী, তোবা টেক সিং এ তার ছিল দোনকে দোন জমি। তারপর হঠাৎ করেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তার পরিবা্র তাকে শিকলে বেঁধে এই পাগলাগারদে নিয়ে আসে আর এখানেই রেখে চলে যায়। মাসে একবার তারা তাকে দেখতে আসত কিন্তু যখন থেকেই এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হল, তখন থেকে তার আত্মীয়রা তাকে দেখতে আসা বন্ধ করে দিল।
তার নাম ছিল ভীষণ সিং কিন্তু সবাই তাকে ডাকত তোবা টেক সিং নামে। তার জানা ছিলনা আজ কী বার, এটা কোন মাস কিংবা কতগুলো বছর তিনি এই পাগলাগারদে পার করেছেন। তবুও যেন সহজাতভাবেই তিনি জানতেন ঠিক কোনদিন তার আত্মীয়রা তাকে দেখতে আসবেন আর সেদিন তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে গোসল করতেন, সাবান দিয়ে সারা শরীর ভাল করে ডলতেন, চুলে তেল দিতেন, আঁচরাতেন এবং পরিস্কার কাপড় পরতেন। যদি তার আত্মীয়রা তাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করত, তিনি চুপ করে থাকতেন অথবা চিৎকার করে বলতেন, -গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি লালটেইন এর মুগডাল।
যখন তাকে পাগলাগারদে নিয়ে আসা হয়, তখন তিনি ঘরে রেখে এসেছিলেন এক ছোট শিশুকন্যা। এখন সে পনের বছরের এক সুন্দরী তরুণী যাকে ভীষণ সিং চিনতে পারেননা। মেয়েটি তাকে দেখতে আসলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারত না।
যখন ভারত-পাকিস্তানের ভাগাভাগির ঝামেলাটা শুরু হয় ভীষণ সিং তার পাগল সাথীদের কাছে প্রায়ই তোবা টেক সিং কোথায় পড়েছে তা জানতে চাইত। কেউ তাকে কোন উত্তর দিতে পারতনা। আর এখনতো দর্শণার্থীদের আসাটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাকে বলে দিত ঠিক কখন দর্শণার্থীরা আসবে। কিন্তু এখন আর তিনি বুঝতে পারেননা। তার ভেতরের কণ্ঠস্বরটা যেন হঠাৎ করেই স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। তিনি পরিবারের সবার অভাবটা খুব টের পাচ্ছিলেন, তারা যে উপহারগুলো তার জন্য নিয়ে আসত, তার জন্য তারা যে উৎকন্ঠা প্রকাশ করত এগুলোর জন্য তার খুব প্রাণ পুড়ছিল। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে তার পরিবারের লোকেরা ঠিকই তাকে বলতে পারত তোবা টেক সিং ভারতে না পাকিস্তানে পড়েছে। তার এমনও মনে হচ্ছিল যে তারা হয়ত তোবা টেক সিং এর তার পুরোনো বাড়ি থেকেই আসত।
উন্মাদদের একজন নিজেকে একদিন ঈশ্বর হিসেবে ঘোষণা করল। একদিন ভীষণ সিং তাকে জিজ্ঞেস করল তোবা টেক সিং কোথায়। তার অভ্যাসমত বিকট এক অট্টহাসি দিয়ে উন্মাদেশ্বর প্রথমে ভীষণ সিংকে অভিবাদন জানাল, তারপর বলল, তোবা টেক সিং ভারত বা পাকিস্তান কোনখানেই না। আসলে এটা কোথাও না কারণ আমি এখনও এটার অবস্থান এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিইনি।
ভীষণ সিং নিজেকে ঈশ্বর ঘোষণা করা এই লোকটাকে অনুরোধ করল সে যেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে সমস্যাটার একটা সুরাহা করে। কিন্তু ঈশ্বরকে মনে হল তিনি অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খুব ব্যস্ত। অবশেষে ভীষণ সিং এর ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল এবং তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন, গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি গুরুজি ডা খালসা আর গুরুজির ফতেহ ও যে বলে সে নিহাল সৎ শ্রী আকাল।
আসলে তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা হল, তুমি আমার আর্জির উত্তর দিচ্ছনা কারণ তুমি আসলে একটা মুসলিম ঈশ্বর। যদি তুমি একটা শিখ ঈশ্বর হতে, তুমি অবশ্যই আমাকে সাহায্য করতে।
উন্মাদ বিনিময়ের নির্ধারিত তারিখটির কয়েকদিন আগে, তোবা টেক সিং এর একজন মুসলিম যিনি ভীষণ সিং এর বন্ধু ছিলেন পাগলাগারদে এলেন তার সাথে দেখা করতে। এর আগে তিনি কখনই ভীষণ সিং এর সাথে দেখা করতে আসেননি। তাঁকে দেখেই ভীষণ সিং একদিকে সটকে পড়তে চাইলেন কিন্তু একজন রক্ষী তার পথ আগলে দাঁড়াল। সে বলল, আপনি কি আপনার দোস্ত ফজল দীনকে চিনতে পারছেন না? উনি আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। ভীষণ সিং ফজল দীনের দিকে চোরা চোখে একবার চাইলেন, তারপর বিড়বিড় করে কী যেন আওড়াতে লাগলেন। ফজল দীন ভীষণ সিং এর কাঁধে হাত রেখে বললেন, অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম তোমাকে একবার দেখে আসি, কিন্তু সময় করতে পারছিলাম না। তোমার বাড়ির সবাই ভাল আছে, ওরা ভালভাবেই ভারতে গিয়ে পৌঁছেছে। আমার যতটুকু সাধ্য ছিল তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করেছি। আর তোমার মেয়ে, রুপ কাউর এতটুকু বলে ফজল দীন একটু ইতস্তুত করছিলেন, তারপর বললেন, সেও ভারতে ভাল আছে, নিরাপদে আছে।
ভীষণ সিং কোন কথাই বললেন না। ফজল দীন বলে গেলেন, তোমার পরিবার আমার কাছে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল যে তুমি ভাল আছ। শীঘ্রই তুমিও ভারতে চলে যাবে। তখন মেহেরবানি করে ভাই বলবীর সিং, ভাই রঘুবীর সিং আর বোন অমৃত কাউরকে আমার সালাম জানিয়ো। ভাই বলবীরকে বল যে ফজল দীন ভাল আছে। যে দুটি বাদামী মহিষ তিনি রেখে গিয়েছিলেন তারাও ভাল আছে। মহিষ দুটোই বাছুর প্রসব করেছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটা বাছুর মরে গেছে। বল যে আমি প্রায়ই তাদের কথা মনে করি আর তাদের বল আমায় লিখে জানাতে যদি আমার তরফ থেকে কোনকিছু করার থাকে।

এরপর  বললেন, এই নাও, তোমার জন্য কিছু বড়ই নিয়ে এসেছিলাম। ভীষণ সিং ফজল দীনের কাছ থেকে উপহারটুকু নিয়ে গার্ডের হাতে দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তোবা টেক সিং কোথায়?
কোথায় আবার, এখানেই, যেখানে এটি সবসময় ছিল।
ভারতে না পাকিস্তানে?
ভারতেও না পাকিস্তানেও না।
এরপর আর একটা শব্দও না বলে ভীষণ সিং অন্যদিকে হেঁটে চলে গেলেন, যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন, গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি পাকিস্তান আর ভারতের দূর ফিতে মুনের মুগডাল।
অবশেষে উন্মাদ বিনিময়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হল। এদেশ থেকে ওদেশে দুদেশের যে সমস্ত পাগলকে স্থানান্তর করা হবে তাদের তালিকা পাঠানো হল আর তারিখ নির্ধারণ করা হল।
এক শীতের সন্ধ্যায় লাহোরের পাগলা গারদ থেকে পুলিশ প্রহরায় হিন্দু আর শিখ পাগলদের ট্রাকে করে সীমান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই বিনিময় পর্ব সুনিশ্চিত করতে সাথে গেল। ওয়াগা সীমান্তের চেক-পোস্টে দুই পক্ষের মোলাকাত হল, নথিপত্র স্বাক্ষরিত হল আর পাগল-বিনিময় পর্ব শুরু হল।
পাগলদের ট্রাক থেকে নামানো আর অপর পক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজটা সহজ ছিলনা মোটেও। কয়েকজন ট্রাক থেকে নামতে অসম্মতি জানাল। যাদেরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নামানো গেল তারা ট্রাক থেকে নেমেই এদিকে ওদিকে দৌঁড়াদৌড়ি শুরু করল। কেউ কেউ একেবারে উলঙ্গ হয়ে গেল। তাদের কাপড় চোপড় পরিয়ে দেয়া মাত্রই তারা সেগুলো আবার ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। তারা গালাগাল দিতে লাগল, গান গাইতে থাকল আর একে অপরের সাথে মারামারি করতে লাগল। অন্যরা কান্না জুড়ে দিল। মহিলা পাগলেরা, যাদেরও বিনিময় করা হচ্ছিল, অন্যদের চেয়েও বেশী চেঁচামেচি করছিল। এক বিশ্রী হট্টগোলে পরিনত হল জায়গাটা। তীব্র ঠাণ্ডায় সবার দাঁত ঠকঠক করে শব্দ করছিল।
অধিকাংশ উন্মাদকেই এই পুরো ব্যাপারটার ঘোরতর বিরোধী বলে মনে হল। তারা কিছুতেই বুঝতে পারছিলনা তাদের কেন জোর করে একটা অচেনা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ আর পাকিস্তান মুর্দাবাদ এর শ্লোগান উঠছিল চারদিকে। শুধুমাত্র সময়মত হস্তক্ষেপের কারণেই বড় ধরণের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভবপর হয়েছিল।
রেজিস্ট্রারে ব্যক্তিগত বিবরণ নথিবদ্ধ করার জন্য যখন ভীষণ সিং এর পালা এল, তখন তিনি ওখানের এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোবা টেক সিং কোথায় পড়ল হে? ভারতে নাকি পাকিস্তানে?
একচোট হেসে ঐ কর্মকর্তা বলল, পাকিস্তানে, আর কোথায় পড়বে!
এটা শুনে ভীষণ সিং ঘুরে দাঁড়ালেন এবং তার সঙ্গীদের সাথে যোগ দিতে দৌঁড় দিলেন। পাকিস্তানী রক্ষীরা তাকে ধরে ফেলল আর চেষ্টা করল তাকে ভারতের দিকে ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে। কিন্তু ভীষণ সিং একচুলও নড়লেননা। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, এটা তোবা টেক সিং। গুড়গুড়ের উপর দখলকরা ধ্যান খাড়ি তোবা টেক সিং আর পাকিস্তানের মুগডাল।
তাকে বারবার বোঝানো হল যে তোবা টেক সিং এখন ভারতের অংশ, অথবা খুব শীঘ্রই ভারতের হয়ে যাবে, কিন্তু এই বোঝানোতে কোন লাভ হলনা। তারা এমনকি তাকে টেনে-হিঁচড়ে সীমানার ওধারে নিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তাও করা গেলনা। ঐখানেই ভীষণ সিং তার ফোলা পা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন যেন পৃথিবীর কোন শক্তিরই সাধ্য নেই যে তাকে ঐখান থেকে সরায়। যেহেতু তিনি ছিল নিরীহ এক বৃদ্ধ, শীঘ্রই অফিসারেরা তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ঠিক সূর্যোদয়ের আগে ভীষণ সিং ভয়াবহ একটা আর্তনাদ করে উঠলেন। সবাই যখন ছুটে গেল সেদিকে তারা দেখল যে লোকটা বিগত পনের বছর ধরে সোজা দাঁড়িয়ে ছিল সে এখন মাটিতে মুখ থুবরে পড়ে আছে। কাঁটাতারের পেছনে একদিকে একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল ভারতের উন্মাদেরা আর আরেকদিকে আরো অনেক কাঁটাতারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল পাকিস্তানের উন্মাদেরা। মাঝখানে একটুকরো নামহীন জমিনের উপর মুখ থুবরে পড়ে ছিল তোবা টেক সিং।




            http://www.sacw.net/partition/tobateksingh.html

গীটার, বেহালা আর বাঁশি
এক বন্ধুই বলেছিল, ‘ একা লাগবেনা আর
কিনে ফেল একটা গীটার অথবা বেহালা
কিংবা নিদেনপক্ষে সস্তা দামের বাঁশের একটা বাঁশি।
গীটারের ছয়টা তারে আঙুল ছোঁয়ালেই দেখবি
অদৃশ্য এক জগত থেকে ছুটে এসেছে ছয়টা অপূর্ব ঋতু,
তাদের রূপ তোর অচেনা, তাদের গল্প তোর শোনা হয়নি কোনদিন,
দেয়ালজুড়ে দেখবি তখন ফুটে উঠেছে ফসলের ঊজ্জ্বল মাঠ
একটু আগের বিষন্ন ঘরে যেন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে
অতিপ্রিয় আড্ডাবাজ ছয়টি পুরোনো বন্ধু।
অথবা বেহালার ছড় যখন ছুঁয়ে দেবে চারটি তার,
যাদুকাঠি ছোঁয়ালে যেভাবে ঘুম থেকে জেগে ওঠে
রূপকথার সুন্দরী রাজকুমারী অনেক গল্প নিয়ে,
তেমনি মুহুর্তেই দীর্ঘ ঘুমের অতলান্তিক সাঁতরে পার হয়ে
তোর ঘরে এসে হাজির হবে করুণ, কোমল, শান্ত সুরের পরীরা
ভালবেসে ছুঁয়ে দিলে দেখবি বিষাদের সুরও হয়ে গেছে ঊচ্ছ্বল।
কিংবা বাঁশিটির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে দীর্ঘ চুম্বনে
যদি তুই জানিয়ে দিতে পারিস তোর প্রণয়াভিলাস
দেখবি তার ছটা খোপ থেকেই বেড়িয়ে আসছে
বিভিন্ন স্বরগ্রামের শিষবাজিয়েওলা পাখির দল,
একা আর লাগবেনা তখন দেখিস নিজেকে।’
এরকম হেঁয়ালিপূর্ণ কথা বলে বন্ধুটি চলে যাবার
কদিন পরেই ঘরে নিয়ে এলাম গীটার, বেহালা, আর বাঁশি।
ভালবাসা শব্দটার শক্তি এতটাই প্রবল যে
কতগুলো নিছক যন্ত্রও একদিন হয়ে ওঠে চিরসখা বন্ধুজন।













শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১১

বাসা বদল



 বারান্দার এককোনার জবা ফুলের গাছটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর অতনুর চোখ দিয়ে আপনা আপনিই কফোঁটা জল বেরিয়ে পড়ল। ফুলগাছটায় এখনও একটা ফুল বিকেলের সবটুকু আলোকে ম্লান করে দিয়ে হেসে হেসে এদিক ওদিক দুলছে। পরম মমতায় গাছটার গায়ে, পাতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে অনেক কথা বলে যায় সে। সেই কবে এক শীতের ছুটিতে ডিসি হিল পার্কের বাহাদুর নার্সারি থেকে ছোট্ট একটা চারা কিনে এনেছিল, রোগা গাছটা আজ বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে গ্রিলের বাইরে গিয়ে চড়ুই আর মৌমাছিদের সাথে খুনসুটি করে। প্রতিদিন ভোরে পাপড়ি মেলে দিয়ে লাল টকটকে সিঁদুরের মত ফুলগুলো তার সূর্যটার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অতনুর ভারী কষ্ট হয় যখন মনে পড়ে এ গাছটিকে এ বারান্দাতে রেখেই কাল ওদের চলে যেতে হবে নতুন বাসায়। কে আর ফুল গাছের জন্য অমন করে ভাববে, হলুদ পাতা সরিয়ে ফেলবে, ভেঙ্গে দেবে কুচক্রী পিঁপড়েদের বাসা? ফুলগুলিও কাকে দেখে বিকেলের মৃদু আলোয় হেসে হেসে কথা বলবে? আজ শেষ বিকেলটা তাই অতনু একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চায় লম্বা বারান্দাটায়।

কতগুলো বছর কাটিয়ে দিল ওরা ১৩ নম্বর আব্দুস সত্তার রোডের এই বাসাটায়। অতনু গুনেগুনে দেখল বিশ বছর। এ ঘরেই বেড়ে উঠেছে সে, কাটিয়েছে শৈশবের হাসিমাখা ঊচ্ছল দিনগুলি, যৌবনের সমস্ত আবেগ, সমস্ত সংরাগ, সমস্ত আগুন এঘরেই লুকিয়ে রেখেছে সে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল চেনে তার হাতের স্পর্শ, মুখস্থ হয়ে গেছে তার ওদের রং-রূপ-গন্ধ। কোন বিন্দুর উত্তাপ কেমন, কোথায় লুকোলে সারাদিনেও কেউ তার টিকিটি খুঁজে পাবেনা আর তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে উদবিগ্ন মা-বাবার কথোপকথন শুনতে পাবে জানা আছে তার। দুষ্টু চড়ুই মিটারের পেছনে ডিম পেড়ে রাখে, রান্নাঘরের কড়াই রাখার তৃতীয় থাকে আছে বহু পুরোনো একটা চৌকো পাঁচ পয়সার কয়েন যার গায়ে আঁকা আছে সুন্দর একটা লাঙ্গল, স্টোর রুমের শেষ মাথায় আছে ফাউন্টেন পেনে লেখা একটা হিসাবের পাতা আর দুটো ছোট ছোট দাঁত- এসব গোপন খবর জানবে কি আর কেউ কখনও? ফিকে হয়ে আসা আকাশটার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকে অতনু আর কিছুক্ষণ পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

গ্রাম থেকে শহরে আসার পর প্রথম ছমাস এদিক ওদিক কাটিয়ে সোজা এ বাসায় এসে শেকড় গেড়েছিল ওরা। অতনুর বয়স তখন কতই বা আর, নয় কি দশ। তিনতলার বাসাটি থেকে যেন পুরো শহরটাই দেখা যেত। চারপাশে তখন আজকের মত এত বিল্ডিং এর আগাছা ছিলনা। সামনে বিশাল খেলার মাঠ, মাঠের ভেতর গ্রিলে ঘেরা একটি ফুলের বাগান, ওতে ফুটে থাকে বাহারী সব ফুল, শিউলি, হাস্নাহেনা, জুঁই, গন্ধরাজ, বেলী। আরও ছিল ব্রোঞ্জ আর সাদা পাথরের কিছু মূর্তি যাদের নামগুলো তার কাছে তখনও ছিল অপরিচিত। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে বুড়ো বুড়ো কিছু মানুষ এসে ওদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পড়িয়ে দিত। খুব ভোরে অতনু ফুল পাড়তে গেলে বাগানের ভেতরের মূর্তিগুলোর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত। কী গনগনে দৃষ্টি সূর্যসেন নামের মূর্তিটির চোখে। বাবা বলত সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী মহান বিপ্লবী, চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিলেন চার দিন। বিপ্লবের মানে কি তখন আর সে বোঝে?

তখন আলো আর হাওয়াদের ছিল অবাধ আসা যাওয়া। রাস্তার মোটরের হর্ণের তীব্র আওয়াজে কান অভ্যস্ত হয়ে এলে ওসব ছাপিয়ে কেবল কানে বাজত শালিক, চড়ুই, দোয়েল, পায়রাদের শিষ। দক্ষিণদিকে সাবেকি আমলের বাংলো বাড়িটি ছিল অনিল বাবুদের। বুড়ো দাদু ভোরবেলা দেউরিতে বসে বসে রোদ পোয়াতেন আর প্রায় রাতেই গাইতেন একটা অদ্ভুত গান, নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচলভরা ফুল। শুনতে শুনতে অতনুর গানটা মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। ঘরের হারমোনিয়ামে সুরটা তুলতেও পারত। ও বাড়ির বিশাল আমগাছটার বেশ কিছু ডাল অতনুদের পূবের বারান্দা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাত বাড়ালেই আম্রপল্লব। প্রতিবছর আমের মৌসুম এলে অতনু দাদাদের সাথে মিলে বিভিন্ন কসরতে কাঁচা আম পেড়ে নিত বুড়ো দাদুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে। মাঝে মাঝে কোন একটা ডালে বাসা বাঁধত পাতিকাক, তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে পাখিটা তখন মানুষ হয়ে উঠত। ঠিক তার মাও গ্রামে ছোটবেলায় এমন করেই তার মুখে খাবার তুলে দিত। অতনু রোজ রোজ এসে দেখত বাচ্চাগুলো কতটুকু বাড়ল, তারপর একদিন দেখত একটা বাচ্চা অন্যটার চেয়ে  আলাদাভাবে ডাকছে, অনেকটা সুর করে করে। মা বলত, এটা কোকিলের ছা। কোকিল চুরি করে এসে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায়। মা কাকটা কিন্তু বাচ্চা দুটোর মুখেই খাবার পুরে দিত। অতনু ভাবতো কাকটা কী বোকা!

বুড়ো দাদুদের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটারা যখন কাজরী গাইতে গাইতে লাফিয়ে পড়ত, ওবাড়ির সুন্দর রেশমী দিদি আঙিনায় এসে বৃষ্টির জলে ভিজত। স্কুলে যেতে হবেনা আজ, ভিজে গেলে জ্বর হবে মা বলত, অথচ অতনু ভেবে পেতনা বৃষ্টির জল বড়দের কেন কাবু করতে পারেনা। সুন্দর রেশমী দিদির বিয়ের দিনে বাড়িটায় সে কি আলো, কত রঙ, সারারাত সানাইয়ের সুর। সন্ধ্যাকাশে একটা দুটো তারা চিকচিক করে উঠতেই সেকথা মনে পড়ে গেল তার।

উত্তরে বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল এনাম কাকুদের বাড়ি। এনাম কাকুর ছেলে টিটু আর মিঠুর সাথে অতনুর দাদাদের ভারি দোস্তি। ওদের সাথে সেও প্রায়ই ফুটবল খেলতে যেত সেখানে। কী বিশাল বাড়ি, সারি সারি সব নারকেল গাছ, একটা কাঁঠাল গাছের ডাল এসে খাবার ঘরের জানলাতে প্রায়ই উঁকি দিত। বাড়ি থেকে তাল এলে মা ঐ কাঁঠাল পাতাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে ওতে তালের রস আর চালের গুড়ো দিয়ে বানাত মজার একটা পিঠা। ও বাড়ির দারোয়ান খোরশেদ মিয়া অতনুদের বিল্ডিং এর দোতলার দিকে চেয়ে চেয়ে সিনেমার গান গাইত, আর বিশ্রী করে হাসত, আর হাত নেড়ে নেড়ে কাকে যেন কীসব বোঝাত। কমাস পর দোতলার কাজের মেয়েটা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়, কাকতালীয়ভাবে খোরশেদ মিয়াও। এ ঘটনার পর মা নিষেধ করে দেওয়ায় অতনুর এনাম কাকুদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বহু বছর পর একদিন খোরশেদ মিয়া আবার ঐ বাড়িতে ফিরে আসে, সাথে আসে ওর বউ, অতনুদের দোতলার কাজের মেয়ে বিউটি। একদিন একটা দূর্ঘটনা ঘটে। ফি-বছর গাছি এসে এনাম কাকুদের নারকেল পেড়ে দিয়ে যেত। ওরকমই কোন একবার নারকেল পাড়ার সময় ইয়া বড় এক নারকেল এসে পড়ে এক পথচারীর মাথায়। আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাওয়া ঐ লোকের ভাগ্যে পরে কী ঘটেছিল অতনুর তা জানা না থাকলেও এ ঘটনার পর এনাম কাকুদের নারকেল গাছগুলো রাস্তার পাশে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলে।

একটু একটু করে অন্ধকার নেমে এসে পূবের আকাশের কলাবতী ফুলের রংটুকুকে গ্রাস করে ফেলে, সেখানে টপটপ করে জ্বলে উঠে রূপালী সব তারা। একটা পুরনো কথা মনে পড়ে যায় ওর, মানুষ মরে গেলে তারা হয়ে যায়। পাড়ায় অতনুর ভাল দুজন বন্ধু ছিল, নিপুল আর রন। দুজনই আজ ঐ আকাশে তারা হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে। মাঠের এককোনে নিপুলের নিজহাতে লাগানো গাছগুলো আকাশ ছুঁইছুঁই করছে, গাছগুলো আছে অথচ ছেলেটা নেই। অতনুরও তো যাওয়ার কথা ছিল রনর বাবার মৃতদেহ নিয়ে ওদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার, শুধু পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে ফিরতে একটু যা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ওরা ওকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, আর পথেই সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা। মাইক্রোবাসটি উলটে গিয়ে আগুন ধরে গেলে জীবন্ত পুড়ে মরে গিয়েছিল ছেলেগুলি। শ্মশানে লাশগুলো চিনতেই পারেনি সে, চিনবে কীকরে, মানুষগুলো তখন সব কয়লা। ভাগ্য বড় নির্মম। কবছর বাদেই এই জানলা দিয়েই অতনু দেখেছে নিপুলের ছোট ভাইটির লাশও আসছে হিমাগারের গাড়ি করে ভোরের মাঠে।

লম্বা বারান্দায় গ্রিলের ছায়া পড়ে তেরছা হয়ে। এই বারান্দায় ও আর ইতু ক্রিকেট খেলতো দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত। ঠক, ঠক, ঠক শব্দে মুখর হয়ে যেত সারাটা দুপুর। এখনও জানলাটার কাঁচে ফাটলটা দেখা যায়, ইতুর ব্যাট জোরে গিয়ে লেগে চিড় ধরে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালা সেদিন এসে বাবাকে বেশ দুকথা শুনিয়ে দিয়েছিল। মেজদার বন্ধুরা এসেও হুল্লোড় করে বারান্দাটা মাথায় তুলে রাখতো মাঝে মাঝে। শনিবার সন্ধ্যায় মাঠ থেকে সোজা সবাই চলে আসত তিন বুদ্বুর হাসির সিরিয়াল দেখতে, তারপর সে কি হাসি, হাসির দমকে পুরো বাড়িটাই কেঁপে উঠতো। এখনও সে হাসির রেশটুকু টের পায় অতনু ঘরের এধারে ওধারে।

রবি-মঙ্গলবার বাবার গানের ক্লাস হত। এই এতগুলো বছরে বাবার কত ছাত্র-ছাত্রী এ বাসায় এল আর গেল। তাদের অনেকেই হয়ে গিয়েছিল এ বাসার খুব আপনজন। তাদের বিভিন্ন রাগের রেওয়াজের সুর মিশে আছে এ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে। লোডশডিং হলে গরমের দিনে চুপটি করে বারান্দায় গিয়ে মা শুনতেন ওদের গান, আর গুনগুনিয়ে ভাঁজতেন হয়তোবা ভূপালী অথবা মালকোষের কোন সুর। অতনুর সব মনে পড়ে যায়। এ ঘরেতেই তার পিতা বাইশটি শ্রুতির মায়াজালে পড়ে প্রবীণ থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন, এ ঘরেতেই তার চাঁদের মতন সুন্দর মার টানটান চামড়া একদিন হয়ে গেছে লোল। প্রতিবছর লক্ষীপূজোয় মা সুন্দর করে গুড়ো চালের রঙ দিয়ে নকশা আঁকতেন দুয়ারে, কালীপূজোর রাতে ওরা সব ভাইয়েরা মিলে জানালায় জানালায় বাতি জ্বালিয়ে পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত জোনাকীর রুপে সাজাতো, নতুন বছরের প্রথম দিনে এ ঘরের প্রতিটি দরোজায় বিহু ফুলের মালা টাঙিয়ে দিত ওরা।স্মৃতির সুর আজ বড় করুণ হয়ে বাজে অতনুর কানে। সবকিছু বাঁধাছাদা হয়ে গেছে, কাল ভোরে এসে মালপত্র নিয়ে যাবে ভাড়া করা লোকজন, রাস্তা দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে অতনু। বুড়ো দাদু মরে গেল, ওরাও একদিন বাড়িটা বেচে দিয়ে চলে গেল, নতুন বাড়ি উঠতে সময় বেশীদিন লাগলোনা। দক্ষিণ দিকে এগারতলার বিশাল দালানটা পুরো বারান্দাটার একাংশ ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখে সারাবেলা। যেদিন ওরা আমগাছটা কেটে ফেলছিল সেদিন অতনুর বুক ফেটে কান্না পেয়েছিল। আমগাছের কাকের নতুন বাসায় তখন দুটো ছোট ছোট ছা। এখন সাদা বাড়িটার একটা খোপে দুটো লক্ষীপেঁচা সারারাত চিৎকার করে ডাকে। মাঝে মাঝে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে চড়ুইয়ের বাসায় আক্রমণ চালায় ওরা। উত্তরদিকে এনাম কাকুদের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায়ও ঢ্যাঙা একটা বিল্ডিং উঠে গেছে। খাবার ঘরে এখন উঁকি মারে ও বাড়ির ছোট্ট অন্তু। কোথাও কোন শালিক নেই, দোয়েল নেই। সামনের মাঠের বাগানে একটাও ফুলের গাছ নেই আর। সূর্যসেনের চাহনিতেও সেই জ্যোতি আর দেখেনা অতনু। বালির মাঠটায় যখন জোর বৃষ্টি হত, তখন নদীর মত ধারা হয়ে জলের রেখা ছুটে যেত বড় নালার দিকে। সে মাঠটাকে ঢেকে ফেলা হয়েছে কনক্রীটের চাদরে। বিকেলে কেউ আর ঘুড়ি ওড়াতে আসেনা আর আজ।

আজ রাতে ঘরটা হুহু করে হয়তো কেঁদে উঠবে। দেয়ালগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়বে মালকোষ আর ভূপালীর সুরেরা। পাঁচ পয়সার আত্মা হয়ত জেগে উঠে বলবে আমাকে ফেলে রেখে চলে যেওনা। বিশটা বছরের স্মৃতি রেখে কাল ভোর হলেই অতনুরা চলে যাবে নতুন বাসায়। তারপর নীচ দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।








আয়োলের গান


আয়োলের গান
-          মারি ফেলিসিতে ইবোকেয়া।


রাগে ফুঁসতে থাকা মহিলা জুতোর হিল দিয়ে যেভাবে মাটি দাবড়ায়, পৃথিবীটাকে ঠিক ওরকমভাবেই পেটাতে থাকা গনগনে সূর্যের নীচে মাথায় বোঝা চাপিয়ে আয়োলে অতিকষ্টে তার কুঁড়ের দিকে চলে যাওয়া পথটি ধরে এগোচ্ছিল। একবার মুহুর্তের জন্য থেমে সে নিঃশ্বাস নিল। একহাত দিয়ে মাথার উপরে থাকা কলসটিকে সামলিয়ে, অন্য হাতটি গোলাকার পেটের উপর রেখে দ্রুত একটা শুকনো বাতাস এক নিঃশ্বাসে বুকে টেনে নিল সে।

যখন থেকে মরুভূমি চারপাশটাকে গিলে নিতে নিতে এগোনো শুরু করেছিল, সে অনেক দিন আগের কথা, তখন থেকেই আয়ালের গ্রামে পানির অভাব। সেইসব মহিলারা, প্রকৃতিই যাদের এখানে ফেলে রেখে গেছে পুরুষেরা নয়, অন্য যেকোন কারো চেয়ে খুব ভাল করেই জানেন এই দূর্লভ বস্তুটির কী মূল্য। বাওবাব গাছের ছায়ায় বসা মুরুব্বিদের ভয়াবহ পঞ্চায়েত সভাটির পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে ঐ সময়ের পর থেকে মহিলারা গ্রামের বাইরে গিয়ে সন্তান প্রসব করবে এবং নবজাত শিশু পায়ে হাঁটা শুরু করার আগ পর্যন্ত তারা আর গ্রামে ফিরে আসবে না।

গলায় উঠে আসা বমির ভাবটাকে দমন করে আয়োলে চেষ্টা করল দুঃশ্চিন্তার ভারটাকে একটু হাল্কা করতে যা তার ভ্রুণশিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। আর মাত্র কদিন পরের অনিবার্য যাত্রাটির কথা মনে করেই কিনা কে জানে, উপযুক্ত সে ক্ষণটির জন্য অপেক্ষমাণ বাচ্চাটি নড়েচড়ে উঠল এবং ফুলে ফেঁপে উঠে শেষ সীমানায় চলে যাওয়া পেটের চামড়া যে সুরক্ষা-তাঁবু তৈরী করেছে সেটিকে উলটে পালটে দিল।

যার জন্য আয়োলের হৃদয় সব-সময় নেচে উঠত সেই মানিলে অনেক দিন আগে শহরে পালিয়ে গিয়েছিল পাগুলো তাকে যতটুকু দ্রুতবেগে চলার শক্তি দিয়েছিল তার সবটুকু দিয়েই। আয়োলে তার পিছু পিছু যেতে চায়নি। মানিলে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিল, হরিণী আমার, যথেষ্ঠ শক্তি কী নেই তোমার!

নীচু ছাদের একটা কুঁড়ের সামনে এসে আয়োলে মাথা থেকে তার সারা দিনের রসদ পানির কলসটি নামাল। মৃদু গোঙানির শব্দ পেয়ে ছোট ভাই আয়োলেলা দ্রুত তার কাছে ছুটে এল।

আজ সকালে আমার বোনটি কেমন আছে? তোমার গুনগুনানি আমাকে তোমার ঘরে ফেরার বার্তা জানিয়েছে আর তোমার জন্য আমি এটা নিয়ে এসেছি। ভাঁজ করা আর আঠা দিয়ে দুইপ্রান্ত জুড়ে দেয়া একটা কাগজের টুকরো সে আয়োলেকে দিল। চিঠি! একটা অদম্য শিহরণ বুকটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল তার।

ভয়ের কিছু নেই, আমার মনে হয়, এটা মানিলের কাছ থেকে এসেছে।

ভারী শরীরটাকে নরম মাদুরের উপর রেখে আয়োলে স্কার্টের কোনা দিয়ে আনমনে কপাল মুছল। তারপর ভাঁজ করা কাগজটা ছুঁয়ে দেখল, দুইদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিল এবং শেষে তার ভাইকে আবার সেটি ফিরিয়ে দিল।

নাও, খোল এটা আর যদি খারাপ কিছু থাকে তবে আমাকে বোলনা।

এবার আয়োলেলার পালা এল চিঠিটা ভাল করে পরখ করার। এটা অনেক দূর থেকে এসেছে। ঘোষণা করল সে। কাগজটা বেশ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ও, তারপর একটু মুচড়ে নিয়ে কয়েকটা জায়গাকে চিহ্নিত করল। শোন তবে...

হরিণী আমার,
আশা করছি যে তোমার শরীরের ভার খুব বেশী হয়ে পড়েনি। মুরুব্বিদের আইনে শুধুমাত্র বুড়ো সিংহগুলোই টিকে থাকবে, একবার তারা সব অল্পবয়সী বুনো পশুগুলোর অপরিপক্ক দাঁতগুলো উপড়ে ফেলতে পারলেই হল। প্রিয় আয়োলে, তোমার বাহুযুগল, যারা জানে কীকরে একজন পুরুষের স্বপ্নকে ধারন করতে হয়, সাকার করতে হয়; তাদের কাছ থেকে হঠাৎ করেই দূরে সরে আসার জন্য আমাকে তুমি ক্ষমা করো। সুন্দরী আমার, প্রিয়তমা, ওরা যেভাবে শহরটাকে এঁকেছে ছবিতে আদতে এর ক্যানভাস অমনটি নয়। মাতিকিন তোমার মতন একজন তরুনীকেই চায়। এখানে আমরা সৌভাগ্য রচনা করব। আমি বৃদ্ধ রাজা সাপিতিয়ের সাথে কথা বলেছি। তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এবং আমাদের অনাগত সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার পূর্বে ভেবে দেখ, আমাদের আর বাচ্চাটার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা কোরো। তবে বেশী সময় নিওনা। মহামহিম এখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর, অরাজকতাই রাজত্ব করবে এবং আমার জেলে যাওয়া বা আরো খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনাও আছে। প্রতিবার চাঁদ যখন পাহাড়ের উপর ওঠে আমি তোমার কথা ভাবি। কল্পনায় দেখি তোমার সোহাগ কিভাবে আমার রাতগুলোকে আনন্দদায়ক করে তুলছে, তোমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকে জিভের তলায় যে তিক্তটা টের পেয়েছি সেটার প্রশমনকারী মধুর চেয়ে ঢের বেশী আনন্দদায়ক তোমার ঐ ভালবাসার ছোঁয়া।
                                                                            তোমার মানিলে, তোমার সন্তানের পিতা।

আয়োলেলা কাগজটি ভাঁজ করে তার বোনের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

সে ভাল করেই জানে যে আমি যাব না। এখানেই আমার পূর্বপুরুষেরা বাস করেছেন, এটিই আমার গল্পের এবং আমার অনাগত সন্তানের জায়গা।

আয়োলে পা ছড়িয়ে দিয়ে বসল। তার চোখ গিয়ে পড়ল ভাইয়ের চোখের উপর।
তাছাড়া, সময় হয়েছে নদীর পাড়ের রাস্তা ধরবার। একটা স্বপ্নালু অভিব্যাক্তি মুখে রেখে পেটের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল সে।

কয়েক দিন পর, আয়োলে আর তার ভাই বিশাল বনটিতে একটিতে জায়গা বেছে নিল তাদের অস্থায়ী ঘর তৈরীর জন্য। ছোট্ট একটা জলাশয়ের কিনারে একটা জায়গা তাদের মনে ধরল যেখানে কিছু বৃক্ষ মিলে একটা গম্বুজের আকার ধারন করেছে। আয়োলের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন দ্রুততর হয়েছে, তাই প্রসব হওয়ার আগে তারা দুজন কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তরুনী আয়োলে সারাদিন গান গাইত আর রাতে ছোট ভাইটিকে শোনাত দারুণ সব গল্প। সে বেশ ওয়াকিবহাল যে আয়োলেলা এখনও ছোট একটা ছেলে যে বোনের প্রতি নিবেদিত-প্রাণা এবং বোনের পাশে থাকতে রাজী থেকে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে।

বড় বড় গাছগুলোর পেছনে চাঁদের আলোর অনুপস্থিতি বনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিকে আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষ রাতের দিকে আয়োলে দুটি শিশুর জন্ম দিল। পুঁচকে মেয়েটা, যার নাম মিনা্লে, সারা রাতভর চেঁচাল। একরত্তির ছেলেটা, হোহোলা যার নাম, মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল আর মিটিমিটি হেসে যেন চিরন্তন ভালবাসার ঘোষনা করে যাচ্ছিল। দুজনের প্রত্যেকেই মায়ের একটি করে স্তনে আঁকড়ে পড়ে থাকল আর লোভীর মতই দুধ খেয়ে যাচ্ছিল। তাদের মা পরিষ্কার পানিভর্তি একটা কলসের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আয়োলেলা মাছ ধরতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল।

দিনগুলো কেবল যায় আর আসে, চাঁদটাও কেবল উঠে আর ডুবে যায়; আর শিশু দুটি একটু একটু করে বড় হতে লাগল। তাদের কাছে জঙ্গলটি বিশাল এক খেলার মাঠ। যখন তাদের মা ব্যস্ত থাকত, মামা তাদের তুলে নিয়ে দীর্ঘ হাঁটার পথে নিয়ে যেত। তারা চিনতে শিখতে লাগল অপেক্ষাকৃত কম হিংস্র পশুগুলোকে। সন্ধ্যাগুলোয় আয়োলে গাইত তার গান আর বাচ্চাদের জন্য বুনত গল্পের জাল।

এক ভাগ্যবিড়ম্বিত দিনে, ছোট্ট মিনালে সাহস করে নদীতে নামতে গেল। একরত্তির ছেলেটা তখন হাত আর পায়ের উপর দিয়ে ভর দিয়ে মায়ের চারপাশে হামাগুড়ি দিচ্ছিল। হঠাৎ মিনালে চিৎকার করে উঠল আর আয়োলের হাত থেকে সাথে সাথেই যে খাবারটা সে কলাপাতায় মুড়ে রাখতে যাচ্ছিল সেটি মাটিতে পড়ে গেল। আয়োলা যখন কাদাময় নদীটির দিকে ছুট লাগাল; ভীত, সন্ত্রস্ত্র হোহোলা তার মায়ের পা আঁকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করল। যখন আয়োলা সেখানে গিয়ে পৌঁছাল, তখন কেবল অসহায়ের মত তাকিয়ে সে দেখল, ঘোড়ার পিঠে সওয়ার তিনজন লোক তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, সাথে নিয়ে যাচ্ছে চিরজীবনের মত তার কান্না আর আর্তনাদকেও।

বিশ বছর পরের কথা। ছোট্ট মিনালে মাতিকিনের রাণী হয়ে গেছে ততদিনে আর সবকিছুর উপর তার জন্মেছে তীব্র বিতৃষ্ণা। তার স্বামী, বৃদ্ধ রাজার মৃত্যুতে কয়েক মাস ব্যাপী চলা ভাতৃঘাতী যুদ্ধের পর শান্তি ফিরে এসেছে আবার। মিনালে একটা সু্রের শিষ কাটল যেটা সবসময় তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আর দুঃখের মুহুর্তগুলোতে যেটি প্রায়ই তার জিভ ছুঁইয়ে যায়।

এখনও পর্যন্ত কেউই এই সুরের উপর কথা বসাতে পারেনি। প্রতিবছর মিনালে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করত যা দলে দলে আকৃষ্ট করত গল্পবলিয়েদের। কিন্তু আজ অবধি কেউ খুঁজে পেলনা সেই কথামালা যা রাণীকে খুশি করতে পা্রে। মিনালে তার বিশাল বৈঠকখানার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল। কেন সে তার বংশপরিচয় সম্পর্কে বেশী কিছু জানল না? সে জানে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার এই জানার তৃষ্ণা মিটছে, নিজের ভেতরে সে শান্তি খুঁজে পাবেনা। সে নিশ্চিত যে এই রহস্যের চাবিকাঠি পাওয়া যাবে সেই গানেই যার জন্য উপযুক্ত কথামালা এখনো অবধি কেউ তার কাছে নিয়ে আসতে পারেনি। রাজা সাপিতিয়ের মৃত্যুর পর থেকে, সে কিছু তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যা রাজা তার কাছে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু সে চায় আরো বেশী করে জানতে।

দরজার উপর ছোট্ট একটা টোকা পড়ল যা কাছের বাগানগুলোতে এতক্ষণ ধরে বিরাজ করতে থাকা সুরের ছন্দপতন ঘটাল।

ভাঙা গলায় মিনালে গর্জে উঠল, কার এমন সাহস এ অসময়ে দরজার কড়া নাড়ে?

আমি আপনার বিদূষক, রাণীমা।

ব্যাপার কী মানিলে?

এখানে একজন বন্দী আছে যে তার কলা প্রদর্শণের পূর্বে আপনার সাথে দেখা করার অনুমতি চায়। একজন গায়ক যে কিনা...

ঠিক আছে, ওকে আসতে দিন।

যথা আজ্ঞা মহারাণী

সাদা কাপড় পরিহিত ধূসর চুলের মানিলে দরজা দুটি খুলে দিয়ে শীর্ণ কাপড়ে ঢাকা তরুনটিকে ঢুকতে দেবার জন্য একটু সরে দাঁড়াল। এ আর কেউ নয়, হোহোলা, খালি পা তার, হাড়জিরজিরে গলায় ঝুলছে অদ্ভুত একটা বাদ্যযন্ত্র। মানিলে বিস্ফারিত নেত্রে ঘরে প্রবেশ করতে থাকা এই ভবঘুরের দিকে তাকিয়ে থাকল, তার নিজের ভয়ার্ত চেহারারই অবিকল প্রতিচ্ছায়া, শুধু বয়সে সে অনেক নবীণ। আপন নিয়তি সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আলতো করে সে দরজাটা বন্ধ করল। গতায়ু রাজা সাপিতিয়ের রাজকাজ্যে আসার পর সে রাজার আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। আয়োলেলার কাছ থেকে তাদের অস্থায়ী ঘরের অবস্থানটি জানার পর সে নিজেই তার পরিবারের অপহরণের পরিকল্পনাটি তৈরী করেছিল। ঐ তিনজন লোককে সে বিদায় জানিয়েছিল এটা বিশ্বাস করে যে ওরা তাদের সঙ্গে করে আয়োলে, তার ভাই আর শিশু দুটিকে নিয়ে আসবে। উত্তেজনা তার চরমে পৌঁছেছিল যখন সে কল্পনায় দেখল আয়োলের গায়ের সুবাস আবার নিতে পারছে। তারপর, রাজপ্রাসাদের বারান্দায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া এক রাজকুমারের কাছ থেকে সে রাজার আসল অভিসন্ধির কথা জানতে পারে- শুধুমাত্র ছোট্ট মিনালের ব্যাপারেই সাপিতিয়ে যত আগ্রহ। ঘোড়সওয়ারদের উপর দায়িত্ব ন্যাস্তই ছিল শুধু মেয়েটিকে এনে দেওয়া। তারা মানুষজন নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারত।

সেদিনের পর থেকে, মানিলে কখনোই তার অপরাধবোধকে শান্ত করতে পারেনি। এটা স্বীকার করতেই হয় যে, রাজা তাকে সারাজীবনের জন্য উপদেষ্টা এবং বিদূষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন ভবিষ্যৎ রাণীর সেবাযত্নের জন্যই এবং আয়োলের মৃত্যুর পর যখন আয়োলা এসেছিল, রাণীর প্রধান পাচক হিসেবে তৎক্ষণাৎ তার চাকরী হয়ে গিয়েছিল। একদিকে যেমন সে শোকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে তার একটা ধারণা জন্মেছিল যে আয়োলের কাছে জমে থাকা ঋণ সে অংশত পরিশোধ করতে পেরেছে। আজ সে প্রথমবারের মত নিজের সন্তানকে দেখল এবং তার মনে হল যেন সে তার স্মৃতির সাথে, তার কাহিনীর সাথে, তার অতীতের সাথে এমনকি তার উচ্চাভিলাষের সাথে সমঝোতা করতে চলেছে। এতগুলো বছরের পর, রাণীমা অবশেষে জানতে চলেছেন সেই তাঁর প্রকৃত পিতা।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথচ গর্বোন্নত আয়োলে নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করল। মানিলে সুচতুরভাবে তাকে ঘরের কোনায় তার কাছে আসার জন্য ইশারা করল যেখানে তাকে দেখা যাচ্ছিল না।

সময় হয়েছে রাণীমার কাছে সত্যটা উন্মোচন করে দেওয়ার। আয়োলের কানে চুপে চুপে বলল মানিলে। সবগুলো ঘটনা একটাই পরিনতির দিকে এগুচ্ছে। ভাইবোনের অবশ্যম্ভাবী মিলন এখন আর কেউই ঠেকাতে পারবেনা। যা করার তা আমাদের খুব দ্রুত করতে হবে, রাজপুত্ররা এরিমধ্যেই ফোঁসফাঁস করা শুরু করেছে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারটা আমি তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি মানিলে। আমার চেয়ে ক্ষমতার ব্যাপারটা তুমিই অনেক ভাল বোঝ, কিন্তু রাণীমাকে জানাতে ভুলোনা যে তাঁর মামা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। শুধু ওদের মার মৃত্যুই আমাকে তোমাকে খুঁজে বের করতে ঠেলে দিয়েছিল আর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁকে।

কিছুক্ষণ পর, মানিলের সাথে কয়েকজন ক্রুদ্ধ ব্যক্তির দেখা হল যারা তক্ষুণিই রাণীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছিল। এইসব অল্পবয়সী রাজকুমারেরা, খুব বেশী অল্পবয়সীও আর নয় তারা, এইমাত্র দেখল যে রাণী, তাদের রাণীমা তাঁর নিজের কক্ষে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত লোককে ঢুকতে দিয়েছে। কিছু বলার জন্য মানিলে তার মুখ খুলল কিন্তু তারা কোনকিছুই শুনতে চাচ্ছিল না। রাজপুত্রদের থামানোর জন্য মানিলে সিদ্ধান্ত নিল তার গল্পটা ওদের সে বলবে। সে তাদের বলল যে রাণী আসলে তারই মেয়ে। যমজ সন্তান দুটির প্রথম জন্মদিনের আগেই একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পুনরায় একত্রিত হওয়ার কাহিনী সে ওদের কাছে উন্মোচণ করে দিল। সে তাদের কথা দিল যে রাণী অবশেষে শান্ত হবেন আর তাদের মধ্য থেকেই যেকোন একজনকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন। সে ভবিষ্যৎবাণী করল যে মাতিকিন এক নতুন শক্তি অধিকারী হবে।

মানিলের গল্প শেষ হওয়া মাত্রই, প্রাসাদের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ গান ভেসে এল। তাদের রাণীমার কণ্ঠ, সুরেলা এবং পরিষ্কার, তার সঙ্গে আর একটা বিষন্ন, চেরা কণ্ঠ, বন্ধ দরজার ওপাশের নীরবতা ভেঙ্গে দিল। সূর্যের আলোয় যেমন করে বৃষ্টির ফোঁটারা নাচে, ঠিক তেমনি স্বর্গীয় এ সঙ্গীত লোকজনকে প্রাসাদের দিকে আকৃষ্ট করে নিয়ে গেল। ইত্যবসরে, বহুদূরের গ্রামে যেখানে আয়োলে মাটির নীচে ঘুমিয়ে আছে সেখানে বৃষ্টির তীব্র একটা ধারা মুরুব্বিদের তাদের বাওবাব গাছের তলা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। যখন কানে তালা লাগিয়ে দেওয়া বজ্রধ্বনি সমস্ত গ্রামটাকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল, তারা মনে মনে বলল, ঈশ্বর, আমাদের মার্জনা করুন। আমাদের সভা বসাতে হবে। মহিলাদের সন্তান জন্ম দান করার নিমিত্তে আর কোনদিন গ্রামের বাইরে পাঠানো হবেনা।

আয়োলের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল।




বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১

আমি কখনোই মা হতে চাই না।




  সেই সকাল থেকে হাঁটছি। রুম থেকে বেরুনোর আগে শুকনো দুটো রুটি চিবিয়ে এ কদিনে চুপসে যাওয়া পেটটাকে একটু আদর করে বলেছিলাম, " এই তোর সুযোগ, এ বেলা যদি না ঝরঝরে, নির্মেদ হতে পেরেছিস তো, আর কখনোই পারবি না।" কখনো কখনো এভাবেই উদ্ভট সব প্রবোধ দিতে হয় নিজেকে।

  কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ বোকা বানিয়ে রাখা যায় নিজেকে। গ্রান ভিয়া দিয়ে হেঁটে মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় পার্কটার কাছে এসে পড়েছি যখন, তখন কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বাঁ পাশের ফুটপাথের উপর জুড়ে বসল একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। চোখ আর পেটের ভারী দোস্তি। আর যাই কোথায়! পেটের ভেতরে হঠাৎ যেন দাঙ্গা লেগে গেল। অতএব, রেস্তোরার বাইরে ফুটপাথের ওপরেই সাজানো চেয়ার-টেবিলে বসে পড়লাম। বেয়ারা গোছের একজন এসে প্রশ্নবোধক ভঙ্গী নিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্পেন দেশে আমি আনপড়, স্প্যানিশ বুঝিনা। মেনুর উপর অনেকক্ষণ চোখ বুলিয়েও যখন কিছু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না, অমন সময় নারীকন্ঠের আওয়াজ, " তোমাকে সাহায্য করতে হবে মনে হচ্ছে? " হতচকিত হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম বাদামী রঙা, চৈনিক চেহারার এক তরুনী। " ও অশেষ ধন্যবাদ, ইয়ে মানে, মেনুটা আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না "। " সে তো দেখতেই পারছি, তুমি কি শাকাহারী। " কোনরকম সূচনা না করেই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল সে। " না, ঠিক তার উলটো, সর্বাহারী। " একবার বেয়ারার দিকে তাকালাম, বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে ওর চোখে-মুখে। " ঠিক আছে, তোমাকে তাহলে একটা ডিশ চেখে দেখতে বলি।" বলেই বেয়ারাকে কী যেন বলল, আঙুল দিয়ে দেখালো দুই, বুঝলাম দুজনের জন্যই একই জিনিস ফরমাশ দিয়েছে। জানিনা কী খেতে চলেছি, আর আসল ব্যাপারটা ও তো জানিনা!!! " ও, তুমি ভাবছো বুঝি, খুব দামী জিনিসের অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, মোটেও না। এটাই এখানের সবচেয়ে সস্তা খাবার, মোটে ছয় ইউরো।" " হেঁ, হেঁ, দামটা নিয়ে কে ভাবছে? দামটা কোন সমস্যাই না।" ঝটপট উত্তর দিলাম।

  জেসিকা আমার নামটা অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পারল দেখে ভাল লাগল। কতজনকে  এই একটা শব্দ কতবার করে যে বলেছি তার ইয়ত্তা নেই। জেসিকা মার্কিনী, মাদ্রিদে এসেছে ওর স্বামীর সাথে বেড়াতে। ভদ্রলোক আবার গান-বাজনার মানুষ। মাদ্রিদেই কোথাও ক্ল্যাসিকাল গিটারের উপর ক্লাশ দিতে এসেছেন। " আমার স্বামী যখন ক্লাশে, তখন ভাবলাম, শহরটা একটু ঘুরে দেখি।" " উত্তম "। জেসিকা'র সপ্রতিভতার জন্যই খুব দ্রুত আমাদের আলাপ জমে উঠল। কথাপ্রসঙ্গে ও জানাল, সে মিশ্র রক্তের মানুষ। তার বাবা আমেরিকান আর মা দক্ষিণ কোরীয়। " আচ্ছা, তাই তো বলি, তোমার চেহারায় চীনা ভাব আছে বেশ। ওফ,সরি। কিছু মনে কোরনা, আমাদের দেশে আমরা এমন সব কথা বিনা দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে ফেলি যা কিনা তোমাদের কাছে বেজায় রূঢ় শোনায়।" " হা হা, না না, আমি কিছু মনে করিনি। আসলে স্কুল থেকেই এ প্রশ্নটা আমি এতো শুনেছি যে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।" ওকে আমি বললাম বাংলাদেশের কথা। আমাদের মানুষের কথা। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতির কথা। জেসিকা জানাল সে কখনো এশিয়ায় আসেনি। তবে এশিয়া সম্পর্কে তার বেশ আগ্রহ।

 কথার পিঠে কথা জুড়ে দিতে দিতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। কামু, সার্ত্র,মার্কেজ থেকে গৌতম বুদ্ধ। জেসিকা জানাল তার ভ্রমণপ্রীতির কথা। বললাম আমিও ঘুরতে ভালবাসি, তবে অনেকদিন ঘরের বাইরে থাকলে মন উতল হয়ে পড়ে। " আমরা বাঙালীদের ঘরকুনো হিসেবে বেশ দুর্নাম আছে। আচ্ছা, তুমি বাবা-মা'কে মিস কর জেসিকা?" " নাহ, ঐ জিনিসটা আমার একদমই নেই।" " মানে?" " মানে, আমি আসলে বাবা-মা'র অভাব্টাই বোধ করিনা। তোমার কাছে ব্যাপারটা বোধয় অদ্ভূত ঠেকছে, না? শোন তবে। "

  " আমার বাবা ছিলেন আমেরিকান মেরিন এর কমান্ডার। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন এক কোরিয়ান নারীকে। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ, আমার বয়স তখন পাঁচ, ছোট বোনটির দুই, মা আমাদের ফেলে রেখে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেন আর আমরা দুবোন বেড়ে উঠি বাবা'র নতুন পরিবারে। আমাদের চার দেওয়ালের ঘরে শুধু আমরা দুবোনের গায়ের রঙ বাদামী, চোখ ছোট; আমাদের পরিপার্শ্ব শুধু সাদা আর সাদা। বাড়িতে যখনই কোন পার্টি হত লোকজন আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাত, স্কুলে সহপাঠিরা আমাদের ক্ষেপাত।"

" ওহ, জেসিকা আমি সত্যিই দুঃখিত। আচ্ছা, তোমার মা কখনও তোমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন না? ফোনে কথা হত না?"

" না। মা কোথায় যে চলে গিয়েছিল তা আমরা জানতাম না। আসলে ঐটুকু বয়সে জানা সম্ভব ও না। তবে আমার বয়স যখন তেইশ, তখন একদিন এক অদ্ভুত ফোন আসে আমার কাছে। এক মহিলা আমাকে বলেন তিনি আমার জন্মদাত্রী মা। আমার সাথে দেখা করতে চান?"

" দেখা হয়েছিল?"

" হুম। উনি আমার ইউনিভার্সিটিতে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে আমার মনে কোন অনুভূতিই জন্ম নেয়নি। দেখলাম চক্ষু কোটরাগত, বিষন্ন চেহারার এক প্রৌঢ়া। আমার ছোট বোনের চেহারার সাথে অদ্ভুত মিল। অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। খাপছাড়া। বললেন একসময় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। হতাশায় আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ও হয়েছেন। তুমি জানো তাঁর প্রতি আমার এমনকি কোন সহানুভূতি ও হচ্ছিল না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের ফেলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিল। বলেছিলেন, কোথাও চলে যাননি, বরং এতটা বছর আমেরিকাতেই ছিলেন, এই শিকাগোতেই।"

" সরি জেসিকা। আমি তোমার মুডটাই খারাপ করে দিলাম।" হাত নেড়ে ও বলল, " আরে নাহ। আমি ঐসব সেন্টিমেন্টালিস্টদের দলে পড়িনা।"

খাওয়া শেষ হয়েই গিয়েছিল। গল্পটা শেষ হতেই বিল চুকিয়ে উঠে গেলাম। ও বলল, " চল কাছের ঐ পার্কটা ঘুরে আসি।" আমিও ওদিকটাতে যাব ভাবছিলাম। তাই বললাম, " বেশ তো, যাওয়া যাক।" পার্ক দেল বুয়েন রেতিরোর ভেতর কতকিছু। রাজপ্রাসাদ, বিশাল দিঘী,ক্রিস্টাল প্যালেস, ঝর্ণা। দিঘীর বুকে দেখলাম ছোট ছোট নৌকায় লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা ঘাসের গালিচা মত একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনেই কতগুলো দেবশিশু ছুটোছুটি, হুল্লোড় করছিল। হঠাৎ বোকার মত বলে বসলাম, " মানুষ হিসেবে তুমি ভাগ্যবান। মা হবার মত অসাধারণ একটা অনুভূতি শুধু তুমিই পাবে, প্রকৃতি এই সৌভাগ্য আমাকে দেয়নি। আফশোস।"

 আমার কথা শুনে চমকে উঠল সে। বেশ জোর গলায় বলল," না। আমি মা হওয়ার মধ্যে অসাধারনত্বের কিছু দেখিনা। তুমি হয়ত শকড হবে আমার কথা শুনে। আমি আসলে কোন সন্তানের মা হতে চাইনা।"

 জেসিকা'র কথা প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, " তোমার স্বামী'র ও কি একই ইচ্ছা?" " তোমাকে তো বলাই হয়নি, মার্ক জার্মান। বিয়ের আগে আমরা দুবছর একসাথে থেকেছি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। মার্ক ও চায়না আমাদের দুজনের ভেতর আর কেউ আসুক। যদি কখনো আমাদের সন্তানের অভাববোধ হয় তবে আমরা দত্তক নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি। এই। আমার শরীরে আরেকটা প্রাণের জন্ম দেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারিনা।"

 " আচ্ছা জেসিকা, তোমার কি মনে হয় অবচেতন মনে তোমার মায়ের ব্যাপারটা তোমার মধ্যে এমন শক্তভাবে গেঁথে আছে যে তোমার ভয় হয় তুমিও তোমার সন্তানকে ফেলে রেখে চলে যাবে? আর এজন্যই তুমি মা হতে চাওনা?"

" জানি না। কে জানে? হবে হয়তো বা।" আনমনে উত্তর দিল ও।

এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল। কথা শেষ করে আমাকে বলল, " মার্ক ফোন করেছিল। ওর ক্লাশ শেষ। আমি উঠছি সুমাদ্রি। তোমার সাথে দেখো কত কথা বলে ফেললাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ সময়টুকু দেওয়ার জন্য। আর হ্যাঁ, তোমাদের নদীর দেশ দেখতে একদিন অবশ্যই যাব। তখন তোমার কথা মনে পড়বে আমার।" এই বলে সে উঠে পড়ল। আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, " ভাল থেকো। মার্ককে আমার শুভেচ্ছা জানিও।" জেসিকার চলে যাওয়ার দিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সামনের ছোট্ট দেবশিশুগুলোর ছুটোছুটি আর হুল্লোড়ে মুখরিত হয়ে উঠছিল বিকেলের পার্কটা।

সিলভা


সিলভার মুখে সেই তেজ আমি আর দেখতে পাইনা। ওকে দেখলে এখন ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া কোন কুটিরের কথা মনে পড়ে।

অথচ এই সেদিনও এই চেহারাতে কী দীপ্তিটাই না ছিল। আমার সাথে দেখা হলেই সলাজ হাসি দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করত। আর আমি ওকে আরও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করতাম, তোমার বান্ধবীর কী খবর? বিয়ে করছ কবে? আমাদের ক্যাম্পের পাশেই ওদের গ্রাম কাসিয়াপ্লু। ক্যাম্পের ছোট্ট হাসপাতালটাতে মঙ্গলবার যখন আশে-পাশের গ্রাম থেকে রোগীরা এসে ভীড় করে, সিলভা  তখন দোভাষী হিসেবে কাজ করে আমাদের ডাক্তার স্যারের সাথে, বিনিময়ে আমরা তাকে দিই মুরগীর মোটা চামড়া যেটা দিয়ে তার মা রাতের খাবারের জন্য একটা সস তৈরী করে। ছাব্বিশ বছরের সমর্থ যুবক হিসেবে পরিবারকে এর চেয়ে বেশী কিছু সাহায্য করতে না পারায় বেচারা সবসময়ই কুন্ঠিত হয়ে থাকে।

ছোটখাটো গাট্টা-গোট্টা গড়নের ছেলেটার বুদ্ধির আভাস পাওয়া যায় ওর কথা-বার্তায়। মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে দূরের কোন গ্রামের পথে গেলে আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাও। ওর সাথে দেখা না হলে অন্য সবার মত আমিও হয়তো ভাবতাম এই জংগলাকীর্ণ প্রত্যন্ত আফ্রিকান গ্রামে আর যাই থাকুক সভ্য মানুষের দেখা হয়ত মিলবেনা। সিলভা আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমার মানসও আসলে বর্ণবাদী সংস্কৃতির ছায়ায় ঢাকা। একদিন ওর গ্রামে কী একটা কাজে গেলে ওর বাড়িতে একটা ঢুঁ মারি। সাধারণ আফ্রিকান বাড়িগুলো দেখেছি একটু অপরিচ্ছন্ন হয়। কিন্তু সিলভাদের ছোট্ট বাড়িটার সবখানে রুচির ছাপ। আমাকে ও দেখাল তার ছোট্ট ঘরটা, ওর বইয়ের তাক, ছবি আঁকার খাতা। মানিব্যাগ থেকে বের করে দেখাল ওর বান্ধবীর ছবি। একটা ঝর্ণার পাড়ে তোলা ছবি। ওকে আবারও একটু লজ্জ্বা পাইয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম, বাহ, বেশ মিষ্টি দেখতে তোমার প্রেমিকা। তো, বিয়েটা করছ কবে তোমরা? মুখে সেই লাজুক হাসিটা টেনে সিলভা বলেছিল, খুব শীঘ্রই। সামনেই আমাদের দেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা। আমি জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওর আত্মবিশ্বাস দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। তাই বলেছিলাম, ধর যদি তুমি চাকরীটা না পাও, আহা ধরই না, চাকরীতো আর আভোকাদো ফলনা, তাও আবার প্রথম শ্রেণীর সরকারী চাকরী, তখন তোমার প্রেমিকার হাত বদল হয়ে যাবেনাতো আবার? কথাটার কী বুঝল সে কে জানে, আমাকে সরাসরি বলেছিল, দেখ আমি বুদ্ধিমান ছেলে, চাকরী আমার না হয়ে যাবে কোথায়? ভেবনা, তুমি আফ্রিকান বিয়ে দেখে যেতে পারবে।

আইভরী কোস্টের রাজধানী আবিদজানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে সিলভা। আবিদজানের গল্প ওর কাছ থেকেই শোনা। কাসিয়াপ্লু গ্রামে জন্ম হলেও ও বেড়ে উঠেছে এই শহরে। ও বলত, আবিদজান গেলে তোমার খুব ভাল লাগবে। জানোতো এ শহরকে আফ্রিকার প্যারিস বলা হয়। চারদিকে শুধু লেগুন। বড়, বড় সব দালান। দক্ষিণ থেকে ভেসে আসে আটলান্টিকের নোনা হাওয়া। তোমাকে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে নিয়ে যাব সুযোগ পেলে। আবিদজান আমি গিয়েছিলাম ঠিকই কয়েক মাস পর, তবে জৌলুসের বদলে এ শহর আমাকে তখন উপহার দিয়েছিল ধ্বংসস্তুপ আর পোড়া মানুষের গন্ধের বিভৎস এক ছবি। এর লেগুনগুলোতে ভেসে যেতে দেখেছি পেটফোলা মরা মানুষের পচা লাশ।

প্রায়শই ও আমাকে বলত, জানো, ফ্রান্স আমাদের দেশটাকে কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবেনা। তোমরা জানো ফ্রান্স হল শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি। ফরাসী দার্শনিকদের বুলি তোমাদের অনুপ্রাণিত করে। অথচ আমাদের দেশটাকে এখনও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রেখে, আমাদের টাকায় ওরা শিল্পোন্নত, সুপার-পাওয়ার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের সমস্ত সমস্যার মূলে কোথাও না কোথাও ফ্রান্সের দুষ্ট হাত লুকোনো থাকে। আমি একটু আহা-উহুঁ করলে ও সুন্দরভাবে আমায় বুঝিয়ে দিত আফ্রিকাকে কীকরে নানা কৌশলে এখনও শোষন করে যাচ্ছে ফ্রান্স। তারপর মুখে একটা দৃঢ় প্রত্যয়ের ভাব এনে সে বলত, তবে দেখ, একদিন আমরা মাথা তুলে দাঁড়াব।

তারপর আইভরী কোস্টে শুরু হল নির্বাচনোত্তর সহিংসতা। বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে একের পর এক শহরের পতন ঘটতে থাকল। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে লেগে গেল নৃশংসতম গৃহযুদ্ধ। দুয়েকুয়ে নামক ছোট্ট শহরে এক রাতেই অনেকগুলো গ্রাম পুড়েছে। গুরো জাতিগোষ্ঠীর হাতে গোনা কজন লোকই সে রাতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল গভীর অরন্যে। আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখেছি সে বর্বরতার চিত্র। আর আবিদজানে বিদ্রোহীরা পৌঁছানোর পর শুরু হল ভয়াবহ যুদ্ধ। আল-জাজিরায় সে যুদ্ধের নিয়মিত ঘটনা পরিক্রমা দেখে আমরা শিউরে উঠতাম। আফ্রিকার প্যারিস আবিদজান তখন যেন একটা মৃত্যুপুরী। এখানে ওখানে পড়ে থাকত লাশ। আর সমস্ত দোকান-পাট ঘর বাড়িতে চলেছে লুঠতরাজ আর ধ্বংসযজ্ঞ। সে কদিন বিভিন্ন কাজে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে সিলভার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর আমি ছুটিতে চলে এলাম ফ্রান্সে। আহা ফ্রান্স- ছবির দেশ, কবিতার দেশ! সিলভার কথা তখন আমি বেমালুম ভুলে গেছি।

মাসাধিককাল ইউরোপে কাটিয়ে যখন আইভরী কোস্টে ফিরে এলাম তখন আফ্রিকা আর আমার মনে ধরেনা। কাজে মন বসেনা। মন পড়ে থাকে ভেনিসের গোলক ধাঁধাময় রাস্তায়। মাদ্রিদের পুরোনো চত্বরগুলোতে। অস্ট্রিয়ার রাজপ্রাসাদের এখানে ওখানে। প্যারিসের বড় বড় মিউজিয়ামগুলোতে। কদিন এভাবে যাওয়ার পর গা ঝাড়া দিয়ে আবার শুরু করলাম কাজ। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে যাওয়া। কী একটা কারণে হঠাৎ কাসিয়াপ্লু যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সেদিন সিলভার কথা মনে পড়ল। খবর দিয়ে ওকে আনালাম। ওর সেই হাসিখুশী চেহারাটা দেখতে পেলাম না। ওর দীপ্তিময় চোখদুটোতে দেখলাম বিষাদ। পরিবেশটা একটু হাল্কা করার জন্য আমি আমার পুরোনো কৌশলটাই আবার প্রয়োগ করলাম। বললাম, কী খবর সিলভা? তোমার বান্ধবীর কেমন আছে? বিয়েটা হচ্ছে তো? সিলভার চেহারায় কোন পরিবর্তন এলোনা, বরং মাথাটা নীচু করে থেকে কিছুক্ষণ পর আমায় বলল, আমায় কী যেন কাজে ডেকেছিলেন? সিলভার বিষন্ন চোখ দুটোতে জলের আভাস বেশ টের পেলাম। ওর কাজটা ওকে বুঝিয়ে দিতেই ও আসি বলে চলে গেল। আমি ঠিক বুঝতে পারলামনা আমার কোন কথাটা ওকে এমন কষ্ট দিতে পারে।

দুদিন পর সিলভার বন্ধু হেনরী আমার কাছে এলে ওকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা তোমার বন্ধু হঠাৎ কী হল? অমন চুপ মেরে গেছে কেন? ওর পরীক্ষাটার কী হল? হেনরী একটু চুপ থেকে বলল, আপনি কিছু শোনেননি? বললাম, না, কেন কী হয়েছে?

-          ফাতু, মানে সিলভার বান্ধবী গুরো সম্প্রদায়ের। দুয়েকুয়েতে ওদের গ্রামটাতে যেদিন রেবেলরা হামলা চালায়, ফাতু সেদিন গ্রামেই ছিল। ওর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা সেদিনের পর থেকে। আপনি বুঝতেই পারছেন ওর ভাগ্যে কী ঘটেছে। ও গ্রামের দুয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইকে কচুকাটা করেছে ওরা। তারপর থেকেই সিলভা চুপ হয়ে গেছে। আর এ গন্ডগোলে সব পরীক্ষাই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

আমি কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল সিলভার লাজুক হাসিটার কথা। আর একটা কাল মিষ্টি মেয়ের ছবি যার পেছনে নেচে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট একটা পাহাড়ী ঝর্ণা।

আফ্রিকায় যখন বৃষ্টি নামে


                                                                  
  গতরাতে বৃষ্টি হল পাগলের প্রলাপের মত অবিশ্রান্ত।আফ্রিকার আকাশ বাংলার আকাশের মত সুনীল হলে কি হবে,এর অভিধানে অভিমান শব্দটি নেই।তাই এখানের বৃষ্টি দেখে একবার ও মনে হয়না আকাশের আজ মন খারাপ। মনে আছে যখন আসি এখানে তখন এক কাল বন্ধুকে বেশ গর্বভরে বলেছিলাম আমি বর্ষার দেশের মানুষ। বৃষ্টির জল আমাদের হৃদয়ের ভাষা বোঝে।কি জানি কি ভেবে বন্ধুটি আমার হেসে বলেছিল আফ্রিকার বর্ষা অতোটা রোমান্টিক নয়।এখানের প্রকৃতির সাথে আমাদের শ্যামলিমার অনেক মিল থাকলেও বৃষ্টি-প্রেমের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কদম ফুলের গাছ কোথাও চোখে পড়লনা এ কমাসে।আহা কদম ফুল!পৃথিবীতে অমন সুন্দর ফুল কটি ফোটে বর্ষাকালে।মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে চারপাশের পাহাড় থেকে যখন ভেসে আসত বুনো কদমের মায়াবী গন্ধ তখন জন কীটস পড়াতে আসা শিক্ষকটি ও হঠাৎ যক্ষের মত বিরহী হয়ে উঠতেন।পৃথিবীর অন্য ভাষায় বর্ষাবন্দনা অমন করে কি হয়েছে কোনকালে?

  রাতে বৃষ্টি হলে তারপরদিন সকালে ক্যাম্পের সামনের পাহাড়ে নেমে আসে মেঘের দল।সে এক অপূর্ব,অপার্থিব দৃশ্য।যেন মনে হয় পাহাড়গুলোকে সান্ত্বনা দিতে আসে ওরা,কিংবা অন্য আকাশের অন্য পৃথিবীর গল্প,ঘ্রাণ নিয়ে আসে ওদের কাছে।এই যে পাহাড়গুলো কার অভিশাপে কত হাজার বছর ধরে মাটির সাথে আটকে পড়ে আছে কে জানে,তাদের জন্য ভারী মায়া হয় মাঝে মাঝে।প্রখর রোদে তারা জ্বলে পুড়ে যায়,দূর্দান্ত হাওয়া তাদের শরীর ছিঁড়ে দেয় আর বৃষ্টির প্রচন্ডতার মাঝে তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে বিদ্যুতের নকশা দেখে আকাশে।লাবণ্য শব্দটা ঠিক মানায়না এ বর্ষার জন্য।যখন আসি এ দেশে তখন মাঝে মাঝে আকাশে আসতেন 'হারমাটান'।লাল ধূলায় আকাশ ঢেকে ফেলে দানবের মত হুংকার ছাড়তে ছাড়তে তিনি ছুটে যেতেন গ্রাম,শহর আর সাভানার ওপর।আচেবির গল্পে পড়েছি পঙ্গপালের ঝাঁকের আকাশ ঢেকে ফেলার কথা।হারমাটানের কবলে পড়লে আমাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝরত,তাই পরবর্তীতে যখনই আকাশে লাল ধূলোর মেঘ দেখতাম আমি ভোঁ দৌঁড় দিয়ে ফিরে আসতাম আমার রুমে,তারপর ঝড় থেমে গেলে খোঁজ নিতাম কার নাক দিয়ে কতটুকু রক্ত ঝরল।

বাংলার বৃষ্টির সাথে অদৃশ্য নুপুরপরা অপ্সরারা নাচে।কান পাতলেই শোনা যায় ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম।গ্রামে টিনের চালে একটা মধুর শব্দ হত,ঝোপ থেকে,ডোবা থেকে অবিরত ব্যাঙেরা প্রণয়গীত গেয়ে যেত।আমরা তখন মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক দৌঁড়ে উঠোন পেরিয়ে চলে যেতাম আম বাগানে,তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে আসতাম ঘরে দুপকেট ভরে কাঁচা আম নিয়ে।কখনো কখনো শিলাবৃষ্টি হলে মা বলতেন, আকাশের ওপারে যে দুষ্টু ছেলেদের দল আছে তারা আমাদের হিংসে করে বরফের ঢিল ছুঁড়ে মারছে।তখন ভেবে কূল পেতামনা ওই সব দুষ্টু ছেলেদের সাথে আমাদের কিসের শত্রুতা।মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শুনতাম,

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

এরকম বর্ষামেদুর দিনে কখনো স্কুলে যেতে না হলে,ঘরে বাবা থাকলে আমি দোতলার একলা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি আকাশ দেখতাম আর ওপারের দুষ্টু ছেলেদের খুঁজে বেড়াতাম। তখন চোখে পড়ত রজনী জেঠা মাথায় জোঁইর চাপিয়ে বিলের কিনারে ঘাস কাটছেন, ওপাড়ার নীলু ইয়া বড় কচুপাতাকে ছাতা বানিয়ে মাথার ওপর ধরে ঘরে ফিরছে,আর চারদিকে সেই অমোঘ সংগীত।ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম। এ সুর বহুদূরের ওপার থেকে ভেসে আসা সুর।

এখানের বৃষ্টি যেন হুংকার ছাড়ে,আমার প্রিফ্যাবের ছাদে দুমদাম কিল বসায়।ভেকেদের গীতে প্রণয়ের লেশমাত্র ও নেই।আমি খুব আশা করে বসে থাকি কোথাও বাজবে মেঘ রাগ কিংবা রবীন্দ্রনাথের গান।বৃষ্টিতে ভেসে আসে বৃশ্চিক আর সাপ।আতঙ্কে আমরা রুমে নিজেদের বন্দী করে রাখি।আমাদের পোষা হরিণ দুটো মায়াময় চোখে ভিজে যেতে থাকে।জলের তোড় মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে যেতে একটা ধারা তৈরী করলে আমার কাগজ দিয়ে নৌকা বানাতে খুব ইচ্ছে করে।ছোটবেলায় এভাবে আমি পাড়ি দিতাম সাগর-মহাসাগর।জানিনা কোন অদ্ভুত কারনে বৃষ্টি এলেই শৈশবটা স্মৃতি থেকে লাফিয়ে পড়তে চায় যৌবনের আঙিনায়।

গতকাল সারাটা রাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হল।এটা বর্ষাকাল শুরুর পূর্বাভাষ।এ ঋতুতে এখানে আকাশ ভেঙে ভেঙে পড়ে।কখনো কখনো টানা এক সপ্তাহ।সকালে দেখলাম মেঘগুলো নেমে এসেছে পাহাড়ের কোলে।হয়তো নতুন কোন পৃথিবীর নতুন কোন গল্প নিয়ে।আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করে মেঘ রাগ কিংবা মায়ের কন্ঠ-

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।