বারান্দার
এককোনার জবা ফুলের গাছটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর অতনুর চোখ দিয়ে আপনা আপনিই কফোঁটা
জল বেরিয়ে পড়ল। ফুলগাছটায় এখনও একটা ফুল বিকেলের সবটুকু আলোকে ম্লান করে দিয়ে হেসে
হেসে এদিক ওদিক দুলছে। পরম মমতায় গাছটার গায়ে, পাতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে অনেক কথা বলে যায় সে। সেই কবে এক শীতের ছুটিতে
ডিসি হিল পার্কের বাহাদুর নার্সারি থেকে ছোট্ট একটা চারা কিনে এনেছিল, রোগা গাছটা আজ বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে গ্রিলের বাইরে গিয়ে
চড়ুই আর মৌমাছিদের সাথে খুনসুটি করে। প্রতিদিন ভোরে পাপড়ি মেলে দিয়ে লাল টকটকে সিঁদুরের
মত ফুলগুলো তার সূর্যটার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অতনুর ভারী কষ্ট হয় যখন মনে পড়ে এ গাছটিকে
এ বারান্দাতে রেখেই কাল ওদের চলে যেতে হবে নতুন বাসায়। কে আর ফুল গাছের জন্য অমন করে
ভাববে, হলুদ পাতা সরিয়ে ফেলবে, ভেঙ্গে দেবে কুচক্রী পিঁপড়েদের বাসা? ফুলগুলিও কাকে দেখে বিকেলের মৃদু আলোয় হেসে হেসে কথা বলবে? আজ শেষ বিকেলটা তাই অতনু একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চায় লম্বা
বারান্দাটায়।
কতগুলো বছর কাটিয়ে দিল ওরা ১৩ নম্বর আব্দুস
সত্তার রোডের এই বাসাটায়। অতনু গুনেগুনে দেখল বিশ বছর। এ ঘরেই বেড়ে উঠেছে সে,
কাটিয়েছে শৈশবের হাসিমাখা ঊচ্ছল দিনগুলি, যৌবনের সমস্ত আবেগ, সমস্ত সংরাগ,
সমস্ত আগুন এঘরেই লুকিয়ে রেখেছে সে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল চেনে
তার হাতের স্পর্শ, মুখস্থ হয়ে গেছে তার ওদের রং-রূপ-গন্ধ। কোন
বিন্দুর উত্তাপ কেমন, কোথায় লুকোলে সারাদিনেও কেউ তার টিকিটি খুঁজে
পাবেনা আর তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে উদবিগ্ন মা-বাবার কথোপকথন শুনতে পাবে জানা আছে তার। দুষ্টু
চড়ুই মিটারের পেছনে ডিম পেড়ে রাখে, রান্নাঘরের কড়াই রাখার
তৃতীয় থাকে আছে বহু পুরোনো একটা চৌকো পাঁচ পয়সার কয়েন যার গায়ে আঁকা আছে সুন্দর একটা
লাঙ্গল, স্টোর রুমের শেষ মাথায় আছে ফাউন্টেন পেনে
লেখা একটা হিসাবের পাতা আর দুটো ছোট ছোট দাঁত- এসব গোপন খবর জানবে কি আর কেউ কখনও?
ফিকে হয়ে আসা আকাশটার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকে অতনু আর কিছুক্ষণ
পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
গ্রাম থেকে শহরে আসার পর প্রথম ছমাস এদিক
ওদিক কাটিয়ে সোজা এ বাসায় এসে শেকড় গেড়েছিল ওরা। অতনুর বয়স তখন কতই বা আর, নয় কি
দশ। তিনতলার বাসাটি থেকে যেন পুরো শহরটাই দেখা যেত। চারপাশে তখন আজকের মত এত
বিল্ডিং এর আগাছা ছিলনা। সামনে বিশাল খেলার মাঠ, মাঠের ভেতর গ্রিলে ঘেরা একটি
ফুলের বাগান, ওতে ফুটে থাকে বাহারী সব ফুল, শিউলি, হাস্নাহেনা, জুঁই, গন্ধরাজ,
বেলী। আরও ছিল ব্রোঞ্জ আর সাদা পাথরের কিছু মূর্তি যাদের নামগুলো তার কাছে তখনও
ছিল অপরিচিত। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে বুড়ো বুড়ো কিছু মানুষ এসে ওদের গলায় গাঁদা
ফুলের মালা পড়িয়ে দিত। খুব ভোরে অতনু ফুল পাড়তে গেলে বাগানের ভেতরের মূর্তিগুলোর
দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত। কী গনগনে দৃষ্টি সূর্যসেন নামের মূর্তিটির চোখে। বাবা
বলত সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী মহান বিপ্লবী, চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিলেন চার
দিন। বিপ্লবের মানে কি তখন আর সে বোঝে?
তখন আলো আর হাওয়াদের ছিল অবাধ আসা যাওয়া। রাস্তার
মোটরের হর্ণের তীব্র আওয়াজে কান অভ্যস্ত হয়ে এলে ওসব ছাপিয়ে কেবল কানে বাজত শালিক,
চড়ুই, দোয়েল, পায়রাদের শিষ। দক্ষিণদিকে সাবেকি আমলের বাংলো বাড়িটি ছিল অনিল
বাবুদের। বুড়ো দাদু ভোরবেলা দেউরিতে বসে বসে রোদ পোয়াতেন আর প্রায় রাতেই গাইতেন
একটা অদ্ভুত গান,“ নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচলভরা ফুল”। শুনতে শুনতে অতনুর গানটা মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। ঘরের হারমোনিয়ামে সুরটা
তুলতেও পারত। ও বাড়ির বিশাল আমগাছটার বেশ কিছু ডাল অতনুদের পূবের বারান্দা ছুঁয়ে
দাঁড়িয়ে থাকত। হাত বাড়ালেই আম্রপল্লব। প্রতিবছর আমের মৌসুম এলে অতনু দাদাদের সাথে
মিলে বিভিন্ন কসরতে কাঁচা আম পেড়ে নিত বুড়ো দাদুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে। মাঝে মাঝে কোন
একটা ডালে বাসা বাঁধত পাতিকাক, তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে পাখিটা তখন মানুষ
হয়ে উঠত। ঠিক তার মাও গ্রামে ছোটবেলায় এমন করেই তার মুখে খাবার তুলে দিত। অতনু রোজ
রোজ এসে দেখত বাচ্চাগুলো কতটুকু বাড়ল, তারপর একদিন দেখত একটা বাচ্চা অন্যটার চেয়ে আলাদাভাবে ডাকছে, অনেকটা সুর করে করে। মা বলত, “ এটা কোকিলের ছা। কোকিল চুরি করে এসে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায়।” মা কাকটা কিন্তু বাচ্চা দুটোর মুখেই খাবার পুরে দিত। অতনু ভাবতো কাকটা কী
বোকা!
বুড়ো দাদুদের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটারা যখন
কাজরী গাইতে গাইতে লাফিয়ে পড়ত, ওবাড়ির সুন্দর রেশমী দিদি আঙিনায় এসে বৃষ্টির জলে
ভিজত। “ স্কুলে যেতে হবেনা আজ, ভিজে গেলে জ্বর হবে” মা বলত, অথচ অতনু ভেবে পেতনা বৃষ্টির জল বড়দের কেন কাবু করতে পারেনা।
সুন্দর রেশমী দিদির বিয়ের দিনে বাড়িটায় সে কি আলো, কত রঙ, সারারাত সানাইয়ের সুর।
সন্ধ্যাকাশে একটা দুটো তারা চিকচিক করে উঠতেই সেকথা মনে পড়ে গেল তার।
উত্তরে বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল এনাম কাকুদের বাড়ি।
এনাম কাকুর ছেলে টিটু আর মিঠুর সাথে অতনুর দাদাদের ভারি দোস্তি। ওদের সাথে সেও
প্রায়ই ফুটবল খেলতে যেত সেখানে। কী বিশাল বাড়ি, সারি সারি সব নারকেল গাছ, একটা
কাঁঠাল গাছের ডাল এসে খাবার ঘরের জানলাতে প্রায়ই উঁকি দিত। বাড়ি থেকে তাল এলে মা ঐ
কাঁঠাল পাতাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে ওতে তালের রস আর চালের গুড়ো দিয়ে বানাত মজার একটা
পিঠা। ও বাড়ির দারোয়ান খোরশেদ মিয়া অতনুদের বিল্ডিং এর দোতলার দিকে চেয়ে চেয়ে
সিনেমার গান গাইত, আর বিশ্রী করে হাসত, আর হাত নেড়ে নেড়ে কাকে যেন কীসব বোঝাত। ক’মাস পর দোতলার কাজের মেয়েটা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়, কাকতালীয়ভাবে খোরশেদ
মিয়াও। এ ঘটনার পর মা নিষেধ করে দেওয়ায় অতনুর এনাম কাকুদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে
যায়। বহু বছর পর একদিন খোরশেদ মিয়া আবার ঐ বাড়িতে ফিরে আসে, সাথে আসে ওর বউ,
অতনুদের দোতলার কাজের মেয়ে বিউটি। একদিন একটা দূর্ঘটনা ঘটে। ফি-বছর গাছি এসে এনাম
কাকুদের নারকেল পেড়ে দিয়ে যেত। ওরকমই কোন একবার নারকেল পাড়ার সময় ইয়া বড় এক নারকেল
এসে পড়ে এক পথচারীর মাথায়। আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাওয়া ঐ লোকের ভাগ্যে পরে কী ঘটেছিল
অতনুর তা জানা না থাকলেও এ ঘটনার পর এনাম কাকুদের নারকেল গাছগুলো রাস্তার পাশে বুক
চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলে।
একটু একটু করে অন্ধকার নেমে এসে পূবের আকাশের কলাবতী
ফুলের রংটুকুকে গ্রাস করে ফেলে, সেখানে টপটপ করে জ্বলে উঠে রূপালী সব তারা। একটা
পুরনো কথা মনে পড়ে যায় ওর, মানুষ মরে গেলে তারা হয়ে যায়। পাড়ায় অতনুর ভাল দুজন
বন্ধু ছিল, নিপুল আর রন। দুজনই আজ ঐ আকাশে তারা হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে। মাঠের এককোনে
নিপুলের নিজহাতে লাগানো গাছগুলো আকাশ ছুঁইছুঁই করছে, গাছগুলো আছে অথচ ছেলেটা নেই। অতনুরও
তো যাওয়ার কথা ছিল রন’র বাবার মৃতদেহ নিয়ে ওদের গ্রামের
বাড়ি যাওয়ার, শুধু পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে ফিরতে একটু যা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ওরা ওকে
ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, আর পথেই সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা। মাইক্রোবাসটি উলটে গিয়ে আগুন
ধরে গেলে জীবন্ত পুড়ে মরে গিয়েছিল ছেলেগুলি। শ্মশানে লাশগুলো চিনতেই পারেনি সে,
চিনবে কীকরে, মানুষগুলো তখন সব কয়লা। ভাগ্য বড় নির্মম। ক’বছর
বাদেই এই জানলা দিয়েই অতনু দেখেছে নিপুলের ছোট ভাইটির লাশও আসছে হিমাগারের গাড়ি
করে ভোরের মাঠে।
লম্বা বারান্দায় গ্রিলের ছায়া পড়ে তেরছা হয়ে। এই
বারান্দায় ও আর ইতু ক্রিকেট খেলতো দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত। ঠক, ঠক, ঠক শব্দে
মুখর হয়ে যেত সারাটা দুপুর। এখনও জানলাটার কাঁচে ফাটলটা দেখা যায়, ইতুর ব্যাট জোরে
গিয়ে লেগে চিড় ধরে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালা সেদিন এসে বাবাকে বেশ দুকথা শুনিয়ে দিয়েছিল।
মেজদা’র বন্ধুরা এসেও হুল্লোড় করে বারান্দাটা
মাথায় তুলে রাখতো মাঝে মাঝে। শনিবার সন্ধ্যায় মাঠ থেকে সোজা সবাই চলে আসত তিন
বুদ্বুর হাসির সিরিয়াল দেখতে, তারপর সে কি হাসি, হাসির দমকে পুরো বাড়িটাই কেঁপে
উঠতো। এখনও সে হাসির রেশটুকু টের পায় অতনু ঘরের এধারে ওধারে।
রবি-মঙ্গলবার বাবার গানের ক্লাস হত। এই এতগুলো বছরে
বাবার কত ছাত্র-ছাত্রী এ বাসায় এল আর গেল। তাদের অনেকেই হয়ে গিয়েছিল এ বাসার খুব
আপনজন। তাদের বিভিন্ন রাগের রেওয়াজের সুর মিশে আছে এ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে।
লোডশডিং হলে গরমের দিনে চুপটি করে বারান্দায় গিয়ে মা শুনতেন ওদের গান, আর
গুনগুনিয়ে ভাঁজতেন হয়তোবা ভূপালী অথবা মালকোষের কোন সুর। অতনুর সব মনে পড়ে যায়। এ
ঘরেতেই তার পিতা বাইশটি শ্রুতির মায়াজালে পড়ে প্রবীণ থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন,
এ ঘরেতেই তার চাঁদের মতন সুন্দর মার টানটান চামড়া একদিন হয়ে গেছে লোল। প্রতিবছর
লক্ষীপূজোয় মা সুন্দর করে গুড়ো চালের রঙ দিয়ে নকশা আঁকতেন দুয়ারে, কালীপূজোর রাতে
ওরা সব ভাইয়েরা মিলে জানালায় জানালায় বাতি জ্বালিয়ে পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত জোনাকীর
রুপে সাজাতো, নতুন বছরের প্রথম দিনে এ ঘরের প্রতিটি দরোজায় বিহু ফুলের মালা টাঙিয়ে
দিত ওরা।স্মৃতির সুর আজ বড় করুণ হয়ে বাজে অতনুর কানে। সবকিছু বাঁধাছাদা হয়ে গেছে,
কাল ভোরে এসে মালপত্র নিয়ে যাবে ভাড়া করা লোকজন, রাস্তা দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার
উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে অতনু। বুড়ো দাদু মরে
গেল, ওরাও একদিন বাড়িটা বেচে দিয়ে চলে গেল, নতুন বাড়ি উঠতে সময় বেশীদিন লাগলোনা।
দক্ষিণ দিকে এগারতলার বিশাল দালানটা পুরো বারান্দাটার একাংশ ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখে
সারাবেলা। যেদিন ওরা আমগাছটা কেটে ফেলছিল সেদিন অতনুর বুক ফেটে কান্না পেয়েছিল।
আমগাছের কাকের নতুন বাসায় তখন দুটো ছোট ছোট ছা। এখন সাদা বাড়িটার একটা খোপে দুটো
লক্ষীপেঁচা সারারাত চিৎকার করে ডাকে। মাঝে মাঝে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে
চড়ুইয়ের বাসায় আক্রমণ চালায় ওরা। উত্তরদিকে এনাম কাকুদের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায়ও
ঢ্যাঙা একটা বিল্ডিং উঠে গেছে। খাবার ঘরে এখন উঁকি মারে ও বাড়ির ছোট্ট অন্তু। কোথাও
কোন শালিক নেই, দোয়েল নেই। সামনের মাঠের বাগানে একটাও ফুলের গাছ নেই আর।
সূর্যসেনের চাহনিতেও সেই জ্যোতি আর দেখেনা অতনু। বালির মাঠটায় যখন জোর বৃষ্টি হত,
তখন নদীর মত ধারা হয়ে জলের রেখা ছুটে যেত বড় নালার দিকে। সে মাঠটাকে ঢেকে ফেলা
হয়েছে কনক্রীটের চাদরে। বিকেলে কেউ আর ঘুড়ি ওড়াতে আসেনা আর আজ।
আজ রাতে ঘরটা হুহু করে হয়তো কেঁদে উঠবে। দেয়ালগুলোর
ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়বে মালকোষ আর ভূপালীর সুরেরা। পাঁচ পয়সার আত্মা হয়ত জেগে উঠে
বলবে আমাকে ফেলে রেখে চলে যেওনা। বিশটা বছরের স্মৃতি রেখে কাল ভোর হলেই অতনুরা চলে
যাবে নতুন বাসায়। তারপর নীচ দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার
জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।