শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১১

বাসা বদল



 বারান্দার এককোনার জবা ফুলের গাছটির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর অতনুর চোখ দিয়ে আপনা আপনিই কফোঁটা জল বেরিয়ে পড়ল। ফুলগাছটায় এখনও একটা ফুল বিকেলের সবটুকু আলোকে ম্লান করে দিয়ে হেসে হেসে এদিক ওদিক দুলছে। পরম মমতায় গাছটার গায়ে, পাতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মনে মনে অনেক কথা বলে যায় সে। সেই কবে এক শীতের ছুটিতে ডিসি হিল পার্কের বাহাদুর নার্সারি থেকে ছোট্ট একটা চারা কিনে এনেছিল, রোগা গাছটা আজ বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে দিয়ে গ্রিলের বাইরে গিয়ে চড়ুই আর মৌমাছিদের সাথে খুনসুটি করে। প্রতিদিন ভোরে পাপড়ি মেলে দিয়ে লাল টকটকে সিঁদুরের মত ফুলগুলো তার সূর্যটার চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। অতনুর ভারী কষ্ট হয় যখন মনে পড়ে এ গাছটিকে এ বারান্দাতে রেখেই কাল ওদের চলে যেতে হবে নতুন বাসায়। কে আর ফুল গাছের জন্য অমন করে ভাববে, হলুদ পাতা সরিয়ে ফেলবে, ভেঙ্গে দেবে কুচক্রী পিঁপড়েদের বাসা? ফুলগুলিও কাকে দেখে বিকেলের মৃদু আলোয় হেসে হেসে কথা বলবে? আজ শেষ বিকেলটা তাই অতনু একান্তে কিছুটা সময় কাটাতে চায় লম্বা বারান্দাটায়।

কতগুলো বছর কাটিয়ে দিল ওরা ১৩ নম্বর আব্দুস সত্তার রোডের এই বাসাটায়। অতনু গুনেগুনে দেখল বিশ বছর। এ ঘরেই বেড়ে উঠেছে সে, কাটিয়েছে শৈশবের হাসিমাখা ঊচ্ছল দিনগুলি, যৌবনের সমস্ত আবেগ, সমস্ত সংরাগ, সমস্ত আগুন এঘরেই লুকিয়ে রেখেছে সে। ঘরের প্রতিটি দেয়াল চেনে তার হাতের স্পর্শ, মুখস্থ হয়ে গেছে তার ওদের রং-রূপ-গন্ধ। কোন বিন্দুর উত্তাপ কেমন, কোথায় লুকোলে সারাদিনেও কেউ তার টিকিটি খুঁজে পাবেনা আর তাড়িয়ে তাড়িয়ে সে উদবিগ্ন মা-বাবার কথোপকথন শুনতে পাবে জানা আছে তার। দুষ্টু চড়ুই মিটারের পেছনে ডিম পেড়ে রাখে, রান্নাঘরের কড়াই রাখার তৃতীয় থাকে আছে বহু পুরোনো একটা চৌকো পাঁচ পয়সার কয়েন যার গায়ে আঁকা আছে সুন্দর একটা লাঙ্গল, স্টোর রুমের শেষ মাথায় আছে ফাউন্টেন পেনে লেখা একটা হিসাবের পাতা আর দুটো ছোট ছোট দাঁত- এসব গোপন খবর জানবে কি আর কেউ কখনও? ফিকে হয়ে আসা আকাশটার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকে অতনু আর কিছুক্ষণ পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

গ্রাম থেকে শহরে আসার পর প্রথম ছমাস এদিক ওদিক কাটিয়ে সোজা এ বাসায় এসে শেকড় গেড়েছিল ওরা। অতনুর বয়স তখন কতই বা আর, নয় কি দশ। তিনতলার বাসাটি থেকে যেন পুরো শহরটাই দেখা যেত। চারপাশে তখন আজকের মত এত বিল্ডিং এর আগাছা ছিলনা। সামনে বিশাল খেলার মাঠ, মাঠের ভেতর গ্রিলে ঘেরা একটি ফুলের বাগান, ওতে ফুটে থাকে বাহারী সব ফুল, শিউলি, হাস্নাহেনা, জুঁই, গন্ধরাজ, বেলী। আরও ছিল ব্রোঞ্জ আর সাদা পাথরের কিছু মূর্তি যাদের নামগুলো তার কাছে তখনও ছিল অপরিচিত। বছরের বিশেষ বিশেষ দিনে বুড়ো বুড়ো কিছু মানুষ এসে ওদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা পড়িয়ে দিত। খুব ভোরে অতনু ফুল পাড়তে গেলে বাগানের ভেতরের মূর্তিগুলোর দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকত। কী গনগনে দৃষ্টি সূর্যসেন নামের মূর্তিটির চোখে। বাবা বলত সূর্যসেন ব্রিটিশ বিরোধী মহান বিপ্লবী, চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেছিলেন চার দিন। বিপ্লবের মানে কি তখন আর সে বোঝে?

তখন আলো আর হাওয়াদের ছিল অবাধ আসা যাওয়া। রাস্তার মোটরের হর্ণের তীব্র আওয়াজে কান অভ্যস্ত হয়ে এলে ওসব ছাপিয়ে কেবল কানে বাজত শালিক, চড়ুই, দোয়েল, পায়রাদের শিষ। দক্ষিণদিকে সাবেকি আমলের বাংলো বাড়িটি ছিল অনিল বাবুদের। বুড়ো দাদু ভোরবেলা দেউরিতে বসে বসে রোদ পোয়াতেন আর প্রায় রাতেই গাইতেন একটা অদ্ভুত গান, নয়ন ভরা জল গো তোমার, আঁচলভরা ফুল। শুনতে শুনতে অতনুর গানটা মুখস্থই হয়ে গিয়েছিল। ঘরের হারমোনিয়ামে সুরটা তুলতেও পারত। ও বাড়ির বিশাল আমগাছটার বেশ কিছু ডাল অতনুদের পূবের বারান্দা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। হাত বাড়ালেই আম্রপল্লব। প্রতিবছর আমের মৌসুম এলে অতনু দাদাদের সাথে মিলে বিভিন্ন কসরতে কাঁচা আম পেড়ে নিত বুড়ো দাদুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে। মাঝে মাঝে কোন একটা ডালে বাসা বাঁধত পাতিকাক, তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে পাখিটা তখন মানুষ হয়ে উঠত। ঠিক তার মাও গ্রামে ছোটবেলায় এমন করেই তার মুখে খাবার তুলে দিত। অতনু রোজ রোজ এসে দেখত বাচ্চাগুলো কতটুকু বাড়ল, তারপর একদিন দেখত একটা বাচ্চা অন্যটার চেয়ে  আলাদাভাবে ডাকছে, অনেকটা সুর করে করে। মা বলত, এটা কোকিলের ছা। কোকিল চুরি করে এসে কাকের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায়। মা কাকটা কিন্তু বাচ্চা দুটোর মুখেই খাবার পুরে দিত। অতনু ভাবতো কাকটা কী বোকা!

বুড়ো দাদুদের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটারা যখন কাজরী গাইতে গাইতে লাফিয়ে পড়ত, ওবাড়ির সুন্দর রেশমী দিদি আঙিনায় এসে বৃষ্টির জলে ভিজত। স্কুলে যেতে হবেনা আজ, ভিজে গেলে জ্বর হবে মা বলত, অথচ অতনু ভেবে পেতনা বৃষ্টির জল বড়দের কেন কাবু করতে পারেনা। সুন্দর রেশমী দিদির বিয়ের দিনে বাড়িটায় সে কি আলো, কত রঙ, সারারাত সানাইয়ের সুর। সন্ধ্যাকাশে একটা দুটো তারা চিকচিক করে উঠতেই সেকথা মনে পড়ে গেল তার।

উত্তরে বিশাল জায়গা জুড়ে ছিল এনাম কাকুদের বাড়ি। এনাম কাকুর ছেলে টিটু আর মিঠুর সাথে অতনুর দাদাদের ভারি দোস্তি। ওদের সাথে সেও প্রায়ই ফুটবল খেলতে যেত সেখানে। কী বিশাল বাড়ি, সারি সারি সব নারকেল গাছ, একটা কাঁঠাল গাছের ডাল এসে খাবার ঘরের জানলাতে প্রায়ই উঁকি দিত। বাড়ি থেকে তাল এলে মা ঐ কাঁঠাল পাতাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে ওতে তালের রস আর চালের গুড়ো দিয়ে বানাত মজার একটা পিঠা। ও বাড়ির দারোয়ান খোরশেদ মিয়া অতনুদের বিল্ডিং এর দোতলার দিকে চেয়ে চেয়ে সিনেমার গান গাইত, আর বিশ্রী করে হাসত, আর হাত নেড়ে নেড়ে কাকে যেন কীসব বোঝাত। কমাস পর দোতলার কাজের মেয়েটা হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যায়, কাকতালীয়ভাবে খোরশেদ মিয়াও। এ ঘটনার পর মা নিষেধ করে দেওয়ায় অতনুর এনাম কাকুদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বহু বছর পর একদিন খোরশেদ মিয়া আবার ঐ বাড়িতে ফিরে আসে, সাথে আসে ওর বউ, অতনুদের দোতলার কাজের মেয়ে বিউটি। একদিন একটা দূর্ঘটনা ঘটে। ফি-বছর গাছি এসে এনাম কাকুদের নারকেল পেড়ে দিয়ে যেত। ওরকমই কোন একবার নারকেল পাড়ার সময় ইয়া বড় এক নারকেল এসে পড়ে এক পথচারীর মাথায়। আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাওয়া ঐ লোকের ভাগ্যে পরে কী ঘটেছিল অতনুর তা জানা না থাকলেও এ ঘটনার পর এনাম কাকুদের নারকেল গাছগুলো রাস্তার পাশে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকারটুকু হারিয়ে ফেলে।

একটু একটু করে অন্ধকার নেমে এসে পূবের আকাশের কলাবতী ফুলের রংটুকুকে গ্রাস করে ফেলে, সেখানে টপটপ করে জ্বলে উঠে রূপালী সব তারা। একটা পুরনো কথা মনে পড়ে যায় ওর, মানুষ মরে গেলে তারা হয়ে যায়। পাড়ায় অতনুর ভাল দুজন বন্ধু ছিল, নিপুল আর রন। দুজনই আজ ঐ আকাশে তারা হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে। মাঠের এককোনে নিপুলের নিজহাতে লাগানো গাছগুলো আকাশ ছুঁইছুঁই করছে, গাছগুলো আছে অথচ ছেলেটা নেই। অতনুরও তো যাওয়ার কথা ছিল রনর বাবার মৃতদেহ নিয়ে ওদের গ্রামের বাড়ি যাওয়ার, শুধু পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে ফিরতে একটু যা দেরি হয়ে গিয়েছিল। ওরা ওকে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, আর পথেই সেই ভয়াবহ দূর্ঘটনা। মাইক্রোবাসটি উলটে গিয়ে আগুন ধরে গেলে জীবন্ত পুড়ে মরে গিয়েছিল ছেলেগুলি। শ্মশানে লাশগুলো চিনতেই পারেনি সে, চিনবে কীকরে, মানুষগুলো তখন সব কয়লা। ভাগ্য বড় নির্মম। কবছর বাদেই এই জানলা দিয়েই অতনু দেখেছে নিপুলের ছোট ভাইটির লাশও আসছে হিমাগারের গাড়ি করে ভোরের মাঠে।

লম্বা বারান্দায় গ্রিলের ছায়া পড়ে তেরছা হয়ে। এই বারান্দায় ও আর ইতু ক্রিকেট খেলতো দুপুরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত। ঠক, ঠক, ঠক শব্দে মুখর হয়ে যেত সারাটা দুপুর। এখনও জানলাটার কাঁচে ফাটলটা দেখা যায়, ইতুর ব্যাট জোরে গিয়ে লেগে চিড় ধরে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালা সেদিন এসে বাবাকে বেশ দুকথা শুনিয়ে দিয়েছিল। মেজদার বন্ধুরা এসেও হুল্লোড় করে বারান্দাটা মাথায় তুলে রাখতো মাঝে মাঝে। শনিবার সন্ধ্যায় মাঠ থেকে সোজা সবাই চলে আসত তিন বুদ্বুর হাসির সিরিয়াল দেখতে, তারপর সে কি হাসি, হাসির দমকে পুরো বাড়িটাই কেঁপে উঠতো। এখনও সে হাসির রেশটুকু টের পায় অতনু ঘরের এধারে ওধারে।

রবি-মঙ্গলবার বাবার গানের ক্লাস হত। এই এতগুলো বছরে বাবার কত ছাত্র-ছাত্রী এ বাসায় এল আর গেল। তাদের অনেকেই হয়ে গিয়েছিল এ বাসার খুব আপনজন। তাদের বিভিন্ন রাগের রেওয়াজের সুর মিশে আছে এ ঘরের দেওয়ালে দেওয়ালে। লোডশডিং হলে গরমের দিনে চুপটি করে বারান্দায় গিয়ে মা শুনতেন ওদের গান, আর গুনগুনিয়ে ভাঁজতেন হয়তোবা ভূপালী অথবা মালকোষের কোন সুর। অতনুর সব মনে পড়ে যায়। এ ঘরেতেই তার পিতা বাইশটি শ্রুতির মায়াজালে পড়ে প্রবীণ থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন, এ ঘরেতেই তার চাঁদের মতন সুন্দর মার টানটান চামড়া একদিন হয়ে গেছে লোল। প্রতিবছর লক্ষীপূজোয় মা সুন্দর করে গুড়ো চালের রঙ দিয়ে নকশা আঁকতেন দুয়ারে, কালীপূজোর রাতে ওরা সব ভাইয়েরা মিলে জানালায় জানালায় বাতি জ্বালিয়ে পুরো ঘরটাকে এক অদ্ভুত জোনাকীর রুপে সাজাতো, নতুন বছরের প্রথম দিনে এ ঘরের প্রতিটি দরোজায় বিহু ফুলের মালা টাঙিয়ে দিত ওরা।স্মৃতির সুর আজ বড় করুণ হয়ে বাজে অতনুর কানে। সবকিছু বাঁধাছাদা হয়ে গেছে, কাল ভোরে এসে মালপত্র নিয়ে যাবে ভাড়া করা লোকজন, রাস্তা দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে অতনু। বুড়ো দাদু মরে গেল, ওরাও একদিন বাড়িটা বেচে দিয়ে চলে গেল, নতুন বাড়ি উঠতে সময় বেশীদিন লাগলোনা। দক্ষিণ দিকে এগারতলার বিশাল দালানটা পুরো বারান্দাটার একাংশ ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখে সারাবেলা। যেদিন ওরা আমগাছটা কেটে ফেলছিল সেদিন অতনুর বুক ফেটে কান্না পেয়েছিল। আমগাছের কাকের নতুন বাসায় তখন দুটো ছোট ছোট ছা। এখন সাদা বাড়িটার একটা খোপে দুটো লক্ষীপেঁচা সারারাত চিৎকার করে ডাকে। মাঝে মাঝে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে চড়ুইয়ের বাসায় আক্রমণ চালায় ওরা। উত্তরদিকে এনাম কাকুদের বিশাল ফাঁকা জায়গাটায়ও ঢ্যাঙা একটা বিল্ডিং উঠে গেছে। খাবার ঘরে এখন উঁকি মারে ও বাড়ির ছোট্ট অন্তু। কোথাও কোন শালিক নেই, দোয়েল নেই। সামনের মাঠের বাগানে একটাও ফুলের গাছ নেই আর। সূর্যসেনের চাহনিতেও সেই জ্যোতি আর দেখেনা অতনু। বালির মাঠটায় যখন জোর বৃষ্টি হত, তখন নদীর মত ধারা হয়ে জলের রেখা ছুটে যেত বড় নালার দিকে। সে মাঠটাকে ঢেকে ফেলা হয়েছে কনক্রীটের চাদরে। বিকেলে কেউ আর ঘুড়ি ওড়াতে আসেনা আর আজ।

আজ রাতে ঘরটা হুহু করে হয়তো কেঁদে উঠবে। দেয়ালগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়বে মালকোষ আর ভূপালীর সুরেরা। পাঁচ পয়সার আত্মা হয়ত জেগে উঠে বলবে আমাকে ফেলে রেখে চলে যেওনা। বিশটা বছরের স্মৃতি রেখে কাল ভোর হলেই অতনুরা চলে যাবে নতুন বাসায়। তারপর নীচ দিয়ে হয়তো কখনও গেলে একবার উপরে তাকিয়ে দেখবে তেতলার জানলা গলে বেরিয়েছে কিনা সিঁদুররঙা কোন জবাফুল।








আয়োলের গান


আয়োলের গান
-          মারি ফেলিসিতে ইবোকেয়া।


রাগে ফুঁসতে থাকা মহিলা জুতোর হিল দিয়ে যেভাবে মাটি দাবড়ায়, পৃথিবীটাকে ঠিক ওরকমভাবেই পেটাতে থাকা গনগনে সূর্যের নীচে মাথায় বোঝা চাপিয়ে আয়োলে অতিকষ্টে তার কুঁড়ের দিকে চলে যাওয়া পথটি ধরে এগোচ্ছিল। একবার মুহুর্তের জন্য থেমে সে নিঃশ্বাস নিল। একহাত দিয়ে মাথার উপরে থাকা কলসটিকে সামলিয়ে, অন্য হাতটি গোলাকার পেটের উপর রেখে দ্রুত একটা শুকনো বাতাস এক নিঃশ্বাসে বুকে টেনে নিল সে।

যখন থেকে মরুভূমি চারপাশটাকে গিলে নিতে নিতে এগোনো শুরু করেছিল, সে অনেক দিন আগের কথা, তখন থেকেই আয়ালের গ্রামে পানির অভাব। সেইসব মহিলারা, প্রকৃতিই যাদের এখানে ফেলে রেখে গেছে পুরুষেরা নয়, অন্য যেকোন কারো চেয়ে খুব ভাল করেই জানেন এই দূর্লভ বস্তুটির কী মূল্য। বাওবাব গাছের ছায়ায় বসা মুরুব্বিদের ভয়াবহ পঞ্চায়েত সভাটির পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে ঐ সময়ের পর থেকে মহিলারা গ্রামের বাইরে গিয়ে সন্তান প্রসব করবে এবং নবজাত শিশু পায়ে হাঁটা শুরু করার আগ পর্যন্ত তারা আর গ্রামে ফিরে আসবে না।

গলায় উঠে আসা বমির ভাবটাকে দমন করে আয়োলে চেষ্টা করল দুঃশ্চিন্তার ভারটাকে একটু হাল্কা করতে যা তার ভ্রুণশিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিল। আর মাত্র কদিন পরের অনিবার্য যাত্রাটির কথা মনে করেই কিনা কে জানে, উপযুক্ত সে ক্ষণটির জন্য অপেক্ষমাণ বাচ্চাটি নড়েচড়ে উঠল এবং ফুলে ফেঁপে উঠে শেষ সীমানায় চলে যাওয়া পেটের চামড়া যে সুরক্ষা-তাঁবু তৈরী করেছে সেটিকে উলটে পালটে দিল।

যার জন্য আয়োলের হৃদয় সব-সময় নেচে উঠত সেই মানিলে অনেক দিন আগে শহরে পালিয়ে গিয়েছিল পাগুলো তাকে যতটুকু দ্রুতবেগে চলার শক্তি দিয়েছিল তার সবটুকু দিয়েই। আয়োলে তার পিছু পিছু যেতে চায়নি। মানিলে তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিল, হরিণী আমার, যথেষ্ঠ শক্তি কী নেই তোমার!

নীচু ছাদের একটা কুঁড়ের সামনে এসে আয়োলে মাথা থেকে তার সারা দিনের রসদ পানির কলসটি নামাল। মৃদু গোঙানির শব্দ পেয়ে ছোট ভাই আয়োলেলা দ্রুত তার কাছে ছুটে এল।

আজ সকালে আমার বোনটি কেমন আছে? তোমার গুনগুনানি আমাকে তোমার ঘরে ফেরার বার্তা জানিয়েছে আর তোমার জন্য আমি এটা নিয়ে এসেছি। ভাঁজ করা আর আঠা দিয়ে দুইপ্রান্ত জুড়ে দেয়া একটা কাগজের টুকরো সে আয়োলেকে দিল। চিঠি! একটা অদম্য শিহরণ বুকটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল তার।

ভয়ের কিছু নেই, আমার মনে হয়, এটা মানিলের কাছ থেকে এসেছে।

ভারী শরীরটাকে নরম মাদুরের উপর রেখে আয়োলে স্কার্টের কোনা দিয়ে আনমনে কপাল মুছল। তারপর ভাঁজ করা কাগজটা ছুঁয়ে দেখল, দুইদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিল এবং শেষে তার ভাইকে আবার সেটি ফিরিয়ে দিল।

নাও, খোল এটা আর যদি খারাপ কিছু থাকে তবে আমাকে বোলনা।

এবার আয়োলেলার পালা এল চিঠিটা ভাল করে পরখ করার। এটা অনেক দূর থেকে এসেছে। ঘোষণা করল সে। কাগজটা বেশ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ও, তারপর একটু মুচড়ে নিয়ে কয়েকটা জায়গাকে চিহ্নিত করল। শোন তবে...

হরিণী আমার,
আশা করছি যে তোমার শরীরের ভার খুব বেশী হয়ে পড়েনি। মুরুব্বিদের আইনে শুধুমাত্র বুড়ো সিংহগুলোই টিকে থাকবে, একবার তারা সব অল্পবয়সী বুনো পশুগুলোর অপরিপক্ক দাঁতগুলো উপড়ে ফেলতে পারলেই হল। প্রিয় আয়োলে, তোমার বাহুযুগল, যারা জানে কীকরে একজন পুরুষের স্বপ্নকে ধারন করতে হয়, সাকার করতে হয়; তাদের কাছ থেকে হঠাৎ করেই দূরে সরে আসার জন্য আমাকে তুমি ক্ষমা করো। সুন্দরী আমার, প্রিয়তমা, ওরা যেভাবে শহরটাকে এঁকেছে ছবিতে আদতে এর ক্যানভাস অমনটি নয়। মাতিকিন তোমার মতন একজন তরুনীকেই চায়। এখানে আমরা সৌভাগ্য রচনা করব। আমি বৃদ্ধ রাজা সাপিতিয়ের সাথে কথা বলেছি। তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে এবং আমাদের অনাগত সন্তানকে নিজের সন্তানরূপে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার পূর্বে ভেবে দেখ, আমাদের আর বাচ্চাটার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা কোরো। তবে বেশী সময় নিওনা। মহামহিম এখন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর মৃত্যুর পর, অরাজকতাই রাজত্ব করবে এবং আমার জেলে যাওয়া বা আরো খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনাও আছে। প্রতিবার চাঁদ যখন পাহাড়ের উপর ওঠে আমি তোমার কথা ভাবি। কল্পনায় দেখি তোমার সোহাগ কিভাবে আমার রাতগুলোকে আনন্দদায়ক করে তুলছে, তোমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাবার পর থেকে জিভের তলায় যে তিক্তটা টের পেয়েছি সেটার প্রশমনকারী মধুর চেয়ে ঢের বেশী আনন্দদায়ক তোমার ঐ ভালবাসার ছোঁয়া।
                                                                            তোমার মানিলে, তোমার সন্তানের পিতা।

আয়োলেলা কাগজটি ভাঁজ করে তার বোনের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

সে ভাল করেই জানে যে আমি যাব না। এখানেই আমার পূর্বপুরুষেরা বাস করেছেন, এটিই আমার গল্পের এবং আমার অনাগত সন্তানের জায়গা।

আয়োলে পা ছড়িয়ে দিয়ে বসল। তার চোখ গিয়ে পড়ল ভাইয়ের চোখের উপর।
তাছাড়া, সময় হয়েছে নদীর পাড়ের রাস্তা ধরবার। একটা স্বপ্নালু অভিব্যাক্তি মুখে রেখে পেটের ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল সে।

কয়েক দিন পর, আয়োলে আর তার ভাই বিশাল বনটিতে একটিতে জায়গা বেছে নিল তাদের অস্থায়ী ঘর তৈরীর জন্য। ছোট্ট একটা জলাশয়ের কিনারে একটা জায়গা তাদের মনে ধরল যেখানে কিছু বৃক্ষ মিলে একটা গম্বুজের আকার ধারন করেছে। আয়োলের শ্বাস-প্রশ্বাস এখন দ্রুততর হয়েছে, তাই প্রসব হওয়ার আগে তারা দুজন কাজে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তরুনী আয়োলে সারাদিন গান গাইত আর রাতে ছোট ভাইটিকে শোনাত দারুণ সব গল্প। সে বেশ ওয়াকিবহাল যে আয়োলেলা এখনও ছোট একটা ছেলে যে বোনের প্রতি নিবেদিত-প্রাণা এবং বোনের পাশে থাকতে রাজী থেকে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে।

বড় বড় গাছগুলোর পেছনে চাঁদের আলোর অনুপস্থিতি বনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিকে আরো বহুগুনে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। শেষ রাতের দিকে আয়োলে দুটি শিশুর জন্ম দিল। পুঁচকে মেয়েটা, যার নাম মিনা্লে, সারা রাতভর চেঁচাল। একরত্তির ছেলেটা, হোহোলা যার নাম, মায়ের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল আর মিটিমিটি হেসে যেন চিরন্তন ভালবাসার ঘোষনা করে যাচ্ছিল। দুজনের প্রত্যেকেই মায়ের একটি করে স্তনে আঁকড়ে পড়ে থাকল আর লোভীর মতই দুধ খেয়ে যাচ্ছিল। তাদের মা পরিষ্কার পানিভর্তি একটা কলসের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আয়োলেলা মাছ ধরতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল।

দিনগুলো কেবল যায় আর আসে, চাঁদটাও কেবল উঠে আর ডুবে যায়; আর শিশু দুটি একটু একটু করে বড় হতে লাগল। তাদের কাছে জঙ্গলটি বিশাল এক খেলার মাঠ। যখন তাদের মা ব্যস্ত থাকত, মামা তাদের তুলে নিয়ে দীর্ঘ হাঁটার পথে নিয়ে যেত। তারা চিনতে শিখতে লাগল অপেক্ষাকৃত কম হিংস্র পশুগুলোকে। সন্ধ্যাগুলোয় আয়োলে গাইত তার গান আর বাচ্চাদের জন্য বুনত গল্পের জাল।

এক ভাগ্যবিড়ম্বিত দিনে, ছোট্ট মিনালে সাহস করে নদীতে নামতে গেল। একরত্তির ছেলেটা তখন হাত আর পায়ের উপর দিয়ে ভর দিয়ে মায়ের চারপাশে হামাগুড়ি দিচ্ছিল। হঠাৎ মিনালে চিৎকার করে উঠল আর আয়োলের হাত থেকে সাথে সাথেই যে খাবারটা সে কলাপাতায় মুড়ে রাখতে যাচ্ছিল সেটি মাটিতে পড়ে গেল। আয়োলা যখন কাদাময় নদীটির দিকে ছুট লাগাল; ভীত, সন্ত্রস্ত্র হোহোলা তার মায়ের পা আঁকড়ে ধরে থাকতে চেষ্টা করল। যখন আয়োলা সেখানে গিয়ে পৌঁছাল, তখন কেবল অসহায়ের মত তাকিয়ে সে দেখল, ঘোড়ার পিঠে সওয়ার তিনজন লোক তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে, সাথে নিয়ে যাচ্ছে চিরজীবনের মত তার কান্না আর আর্তনাদকেও।

বিশ বছর পরের কথা। ছোট্ট মিনালে মাতিকিনের রাণী হয়ে গেছে ততদিনে আর সবকিছুর উপর তার জন্মেছে তীব্র বিতৃষ্ণা। তার স্বামী, বৃদ্ধ রাজার মৃত্যুতে কয়েক মাস ব্যাপী চলা ভাতৃঘাতী যুদ্ধের পর শান্তি ফিরে এসেছে আবার। মিনালে একটা সু্রের শিষ কাটল যেটা সবসময় তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আর দুঃখের মুহুর্তগুলোতে যেটি প্রায়ই তার জিভ ছুঁইয়ে যায়।

এখনও পর্যন্ত কেউই এই সুরের উপর কথা বসাতে পারেনি। প্রতিবছর মিনালে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করত যা দলে দলে আকৃষ্ট করত গল্পবলিয়েদের। কিন্তু আজ অবধি কেউ খুঁজে পেলনা সেই কথামালা যা রাণীকে খুশি করতে পা্রে। মিনালে তার বিশাল বৈঠকখানার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল। কেন সে তার বংশপরিচয় সম্পর্কে বেশী কিছু জানল না? সে জানে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার এই জানার তৃষ্ণা মিটছে, নিজের ভেতরে সে শান্তি খুঁজে পাবেনা। সে নিশ্চিত যে এই রহস্যের চাবিকাঠি পাওয়া যাবে সেই গানেই যার জন্য উপযুক্ত কথামালা এখনো অবধি কেউ তার কাছে নিয়ে আসতে পারেনি। রাজা সাপিতিয়ের মৃত্যুর পর থেকে, সে কিছু তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যা রাজা তার কাছে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু সে চায় আরো বেশী করে জানতে।

দরজার উপর ছোট্ট একটা টোকা পড়ল যা কাছের বাগানগুলোতে এতক্ষণ ধরে বিরাজ করতে থাকা সুরের ছন্দপতন ঘটাল।

ভাঙা গলায় মিনালে গর্জে উঠল, কার এমন সাহস এ অসময়ে দরজার কড়া নাড়ে?

আমি আপনার বিদূষক, রাণীমা।

ব্যাপার কী মানিলে?

এখানে একজন বন্দী আছে যে তার কলা প্রদর্শণের পূর্বে আপনার সাথে দেখা করার অনুমতি চায়। একজন গায়ক যে কিনা...

ঠিক আছে, ওকে আসতে দিন।

যথা আজ্ঞা মহারাণী

সাদা কাপড় পরিহিত ধূসর চুলের মানিলে দরজা দুটি খুলে দিয়ে শীর্ণ কাপড়ে ঢাকা তরুনটিকে ঢুকতে দেবার জন্য একটু সরে দাঁড়াল। এ আর কেউ নয়, হোহোলা, খালি পা তার, হাড়জিরজিরে গলায় ঝুলছে অদ্ভুত একটা বাদ্যযন্ত্র। মানিলে বিস্ফারিত নেত্রে ঘরে প্রবেশ করতে থাকা এই ভবঘুরের দিকে তাকিয়ে থাকল, তার নিজের ভয়ার্ত চেহারারই অবিকল প্রতিচ্ছায়া, শুধু বয়সে সে অনেক নবীণ। আপন নিয়তি সম্পর্কে ভাবতে ভাবতে আলতো করে সে দরজাটা বন্ধ করল। গতায়ু রাজা সাপিতিয়ের রাজকাজ্যে আসার পর সে রাজার আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। আয়োলেলার কাছ থেকে তাদের অস্থায়ী ঘরের অবস্থানটি জানার পর সে নিজেই তার পরিবারের অপহরণের পরিকল্পনাটি তৈরী করেছিল। ঐ তিনজন লোককে সে বিদায় জানিয়েছিল এটা বিশ্বাস করে যে ওরা তাদের সঙ্গে করে আয়োলে, তার ভাই আর শিশু দুটিকে নিয়ে আসবে। উত্তেজনা তার চরমে পৌঁছেছিল যখন সে কল্পনায় দেখল আয়োলের গায়ের সুবাস আবার নিতে পারছে। তারপর, রাজপ্রাসাদের বারান্দায় হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া এক রাজকুমারের কাছ থেকে সে রাজার আসল অভিসন্ধির কথা জানতে পারে- শুধুমাত্র ছোট্ট মিনালের ব্যাপারেই সাপিতিয়ে যত আগ্রহ। ঘোড়সওয়ারদের উপর দায়িত্ব ন্যাস্তই ছিল শুধু মেয়েটিকে এনে দেওয়া। তারা মানুষজন নিয়ে যা খুশি তাই করতে পারত।

সেদিনের পর থেকে, মানিলে কখনোই তার অপরাধবোধকে শান্ত করতে পারেনি। এটা স্বীকার করতেই হয় যে, রাজা তাকে সারাজীবনের জন্য উপদেষ্টা এবং বিদূষক হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন ভবিষ্যৎ রাণীর সেবাযত্নের জন্যই এবং আয়োলের মৃত্যুর পর যখন আয়োলা এসেছিল, রাণীর প্রধান পাচক হিসেবে তৎক্ষণাৎ তার চাকরী হয়ে গিয়েছিল। একদিকে যেমন সে শোকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে তার একটা ধারণা জন্মেছিল যে আয়োলের কাছে জমে থাকা ঋণ সে অংশত পরিশোধ করতে পেরেছে। আজ সে প্রথমবারের মত নিজের সন্তানকে দেখল এবং তার মনে হল যেন সে তার স্মৃতির সাথে, তার কাহিনীর সাথে, তার অতীতের সাথে এমনকি তার উচ্চাভিলাষের সাথে সমঝোতা করতে চলেছে। এতগুলো বছরের পর, রাণীমা অবশেষে জানতে চলেছেন সেই তাঁর প্রকৃত পিতা।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথচ গর্বোন্নত আয়োলে নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করল। মানিলে সুচতুরভাবে তাকে ঘরের কোনায় তার কাছে আসার জন্য ইশারা করল যেখানে তাকে দেখা যাচ্ছিল না।

সময় হয়েছে রাণীমার কাছে সত্যটা উন্মোচন করে দেওয়ার। আয়োলের কানে চুপে চুপে বলল মানিলে। সবগুলো ঘটনা একটাই পরিনতির দিকে এগুচ্ছে। ভাইবোনের অবশ্যম্ভাবী মিলন এখন আর কেউই ঠেকাতে পারবেনা। যা করার তা আমাদের খুব দ্রুত করতে হবে, রাজপুত্ররা এরিমধ্যেই ফোঁসফাঁস করা শুরু করেছে চারপাশে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভারটা আমি তোমার উপর ছেড়ে দিচ্ছি মানিলে। আমার চেয়ে ক্ষমতার ব্যাপারটা তুমিই অনেক ভাল বোঝ, কিন্তু রাণীমাকে জানাতে ভুলোনা যে তাঁর মামা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনে আমি কখনো ব্যর্থ হইনি। শুধু ওদের মার মৃত্যুই আমাকে তোমাকে খুঁজে বের করতে ঠেলে দিয়েছিল আর আমি খুঁজে পেয়েছিলাম তাঁকে।

কিছুক্ষণ পর, মানিলের সাথে কয়েকজন ক্রুদ্ধ ব্যক্তির দেখা হল যারা তক্ষুণিই রাণীর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছিল। এইসব অল্পবয়সী রাজকুমারেরা, খুব বেশী অল্পবয়সীও আর নয় তারা, এইমাত্র দেখল যে রাণী, তাদের রাণীমা তাঁর নিজের কক্ষে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত লোককে ঢুকতে দিয়েছে। কিছু বলার জন্য মানিলে তার মুখ খুলল কিন্তু তারা কোনকিছুই শুনতে চাচ্ছিল না। রাজপুত্রদের থামানোর জন্য মানিলে সিদ্ধান্ত নিল তার গল্পটা ওদের সে বলবে। সে তাদের বলল যে রাণী আসলে তারই মেয়ে। যমজ সন্তান দুটির প্রথম জন্মদিনের আগেই একে অপরের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত পুনরায় একত্রিত হওয়ার কাহিনী সে ওদের কাছে উন্মোচণ করে দিল। সে তাদের কথা দিল যে রাণী অবশেষে শান্ত হবেন আর তাদের মধ্য থেকেই যেকোন একজনকে স্বামী হিসেবে বেছে নেবেন। সে ভবিষ্যৎবাণী করল যে মাতিকিন এক নতুন শক্তি অধিকারী হবে।

মানিলের গল্প শেষ হওয়া মাত্রই, প্রাসাদের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ গান ভেসে এল। তাদের রাণীমার কণ্ঠ, সুরেলা এবং পরিষ্কার, তার সঙ্গে আর একটা বিষন্ন, চেরা কণ্ঠ, বন্ধ দরজার ওপাশের নীরবতা ভেঙ্গে দিল। সূর্যের আলোয় যেমন করে বৃষ্টির ফোঁটারা নাচে, ঠিক তেমনি স্বর্গীয় এ সঙ্গীত লোকজনকে প্রাসাদের দিকে আকৃষ্ট করে নিয়ে গেল। ইত্যবসরে, বহুদূরের গ্রামে যেখানে আয়োলে মাটির নীচে ঘুমিয়ে আছে সেখানে বৃষ্টির তীব্র একটা ধারা মুরুব্বিদের তাদের বাওবাব গাছের তলা থেকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। যখন কানে তালা লাগিয়ে দেওয়া বজ্রধ্বনি সমস্ত গ্রামটাকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল, তারা মনে মনে বলল, ঈশ্বর, আমাদের মার্জনা করুন। আমাদের সভা বসাতে হবে। মহিলাদের সন্তান জন্ম দান করার নিমিত্তে আর কোনদিন গ্রামের বাইরে পাঠানো হবেনা।

আয়োলের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল।




বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১

আমি কখনোই মা হতে চাই না।




  সেই সকাল থেকে হাঁটছি। রুম থেকে বেরুনোর আগে শুকনো দুটো রুটি চিবিয়ে এ কদিনে চুপসে যাওয়া পেটটাকে একটু আদর করে বলেছিলাম, " এই তোর সুযোগ, এ বেলা যদি না ঝরঝরে, নির্মেদ হতে পেরেছিস তো, আর কখনোই পারবি না।" কখনো কখনো এভাবেই উদ্ভট সব প্রবোধ দিতে হয় নিজেকে।

  কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ বোকা বানিয়ে রাখা যায় নিজেকে। গ্রান ভিয়া দিয়ে হেঁটে মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় পার্কটার কাছে এসে পড়েছি যখন, তখন কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বাঁ পাশের ফুটপাথের উপর জুড়ে বসল একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। চোখ আর পেটের ভারী দোস্তি। আর যাই কোথায়! পেটের ভেতরে হঠাৎ যেন দাঙ্গা লেগে গেল। অতএব, রেস্তোরার বাইরে ফুটপাথের ওপরেই সাজানো চেয়ার-টেবিলে বসে পড়লাম। বেয়ারা গোছের একজন এসে প্রশ্নবোধক ভঙ্গী নিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্পেন দেশে আমি আনপড়, স্প্যানিশ বুঝিনা। মেনুর উপর অনেকক্ষণ চোখ বুলিয়েও যখন কিছু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না, অমন সময় নারীকন্ঠের আওয়াজ, " তোমাকে সাহায্য করতে হবে মনে হচ্ছে? " হতচকিত হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম বাদামী রঙা, চৈনিক চেহারার এক তরুনী। " ও অশেষ ধন্যবাদ, ইয়ে মানে, মেনুটা আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না "। " সে তো দেখতেই পারছি, তুমি কি শাকাহারী। " কোনরকম সূচনা না করেই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল সে। " না, ঠিক তার উলটো, সর্বাহারী। " একবার বেয়ারার দিকে তাকালাম, বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে ওর চোখে-মুখে। " ঠিক আছে, তোমাকে তাহলে একটা ডিশ চেখে দেখতে বলি।" বলেই বেয়ারাকে কী যেন বলল, আঙুল দিয়ে দেখালো দুই, বুঝলাম দুজনের জন্যই একই জিনিস ফরমাশ দিয়েছে। জানিনা কী খেতে চলেছি, আর আসল ব্যাপারটা ও তো জানিনা!!! " ও, তুমি ভাবছো বুঝি, খুব দামী জিনিসের অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, মোটেও না। এটাই এখানের সবচেয়ে সস্তা খাবার, মোটে ছয় ইউরো।" " হেঁ, হেঁ, দামটা নিয়ে কে ভাবছে? দামটা কোন সমস্যাই না।" ঝটপট উত্তর দিলাম।

  জেসিকা আমার নামটা অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পারল দেখে ভাল লাগল। কতজনকে  এই একটা শব্দ কতবার করে যে বলেছি তার ইয়ত্তা নেই। জেসিকা মার্কিনী, মাদ্রিদে এসেছে ওর স্বামীর সাথে বেড়াতে। ভদ্রলোক আবার গান-বাজনার মানুষ। মাদ্রিদেই কোথাও ক্ল্যাসিকাল গিটারের উপর ক্লাশ দিতে এসেছেন। " আমার স্বামী যখন ক্লাশে, তখন ভাবলাম, শহরটা একটু ঘুরে দেখি।" " উত্তম "। জেসিকা'র সপ্রতিভতার জন্যই খুব দ্রুত আমাদের আলাপ জমে উঠল। কথাপ্রসঙ্গে ও জানাল, সে মিশ্র রক্তের মানুষ। তার বাবা আমেরিকান আর মা দক্ষিণ কোরীয়। " আচ্ছা, তাই তো বলি, তোমার চেহারায় চীনা ভাব আছে বেশ। ওফ,সরি। কিছু মনে কোরনা, আমাদের দেশে আমরা এমন সব কথা বিনা দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে ফেলি যা কিনা তোমাদের কাছে বেজায় রূঢ় শোনায়।" " হা হা, না না, আমি কিছু মনে করিনি। আসলে স্কুল থেকেই এ প্রশ্নটা আমি এতো শুনেছি যে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।" ওকে আমি বললাম বাংলাদেশের কথা। আমাদের মানুষের কথা। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতির কথা। জেসিকা জানাল সে কখনো এশিয়ায় আসেনি। তবে এশিয়া সম্পর্কে তার বেশ আগ্রহ।

 কথার পিঠে কথা জুড়ে দিতে দিতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। কামু, সার্ত্র,মার্কেজ থেকে গৌতম বুদ্ধ। জেসিকা জানাল তার ভ্রমণপ্রীতির কথা। বললাম আমিও ঘুরতে ভালবাসি, তবে অনেকদিন ঘরের বাইরে থাকলে মন উতল হয়ে পড়ে। " আমরা বাঙালীদের ঘরকুনো হিসেবে বেশ দুর্নাম আছে। আচ্ছা, তুমি বাবা-মা'কে মিস কর জেসিকা?" " নাহ, ঐ জিনিসটা আমার একদমই নেই।" " মানে?" " মানে, আমি আসলে বাবা-মা'র অভাব্টাই বোধ করিনা। তোমার কাছে ব্যাপারটা বোধয় অদ্ভূত ঠেকছে, না? শোন তবে। "

  " আমার বাবা ছিলেন আমেরিকান মেরিন এর কমান্ডার। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন এক কোরিয়ান নারীকে। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ, আমার বয়স তখন পাঁচ, ছোট বোনটির দুই, মা আমাদের ফেলে রেখে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেন আর আমরা দুবোন বেড়ে উঠি বাবা'র নতুন পরিবারে। আমাদের চার দেওয়ালের ঘরে শুধু আমরা দুবোনের গায়ের রঙ বাদামী, চোখ ছোট; আমাদের পরিপার্শ্ব শুধু সাদা আর সাদা। বাড়িতে যখনই কোন পার্টি হত লোকজন আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাত, স্কুলে সহপাঠিরা আমাদের ক্ষেপাত।"

" ওহ, জেসিকা আমি সত্যিই দুঃখিত। আচ্ছা, তোমার মা কখনও তোমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন না? ফোনে কথা হত না?"

" না। মা কোথায় যে চলে গিয়েছিল তা আমরা জানতাম না। আসলে ঐটুকু বয়সে জানা সম্ভব ও না। তবে আমার বয়স যখন তেইশ, তখন একদিন এক অদ্ভুত ফোন আসে আমার কাছে। এক মহিলা আমাকে বলেন তিনি আমার জন্মদাত্রী মা। আমার সাথে দেখা করতে চান?"

" দেখা হয়েছিল?"

" হুম। উনি আমার ইউনিভার্সিটিতে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে আমার মনে কোন অনুভূতিই জন্ম নেয়নি। দেখলাম চক্ষু কোটরাগত, বিষন্ন চেহারার এক প্রৌঢ়া। আমার ছোট বোনের চেহারার সাথে অদ্ভুত মিল। অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। খাপছাড়া। বললেন একসময় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। হতাশায় আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ও হয়েছেন। তুমি জানো তাঁর প্রতি আমার এমনকি কোন সহানুভূতি ও হচ্ছিল না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের ফেলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিল। বলেছিলেন, কোথাও চলে যাননি, বরং এতটা বছর আমেরিকাতেই ছিলেন, এই শিকাগোতেই।"

" সরি জেসিকা। আমি তোমার মুডটাই খারাপ করে দিলাম।" হাত নেড়ে ও বলল, " আরে নাহ। আমি ঐসব সেন্টিমেন্টালিস্টদের দলে পড়িনা।"

খাওয়া শেষ হয়েই গিয়েছিল। গল্পটা শেষ হতেই বিল চুকিয়ে উঠে গেলাম। ও বলল, " চল কাছের ঐ পার্কটা ঘুরে আসি।" আমিও ওদিকটাতে যাব ভাবছিলাম। তাই বললাম, " বেশ তো, যাওয়া যাক।" পার্ক দেল বুয়েন রেতিরোর ভেতর কতকিছু। রাজপ্রাসাদ, বিশাল দিঘী,ক্রিস্টাল প্যালেস, ঝর্ণা। দিঘীর বুকে দেখলাম ছোট ছোট নৌকায় লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা ঘাসের গালিচা মত একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনেই কতগুলো দেবশিশু ছুটোছুটি, হুল্লোড় করছিল। হঠাৎ বোকার মত বলে বসলাম, " মানুষ হিসেবে তুমি ভাগ্যবান। মা হবার মত অসাধারণ একটা অনুভূতি শুধু তুমিই পাবে, প্রকৃতি এই সৌভাগ্য আমাকে দেয়নি। আফশোস।"

 আমার কথা শুনে চমকে উঠল সে। বেশ জোর গলায় বলল," না। আমি মা হওয়ার মধ্যে অসাধারনত্বের কিছু দেখিনা। তুমি হয়ত শকড হবে আমার কথা শুনে। আমি আসলে কোন সন্তানের মা হতে চাইনা।"

 জেসিকা'র কথা প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, " তোমার স্বামী'র ও কি একই ইচ্ছা?" " তোমাকে তো বলাই হয়নি, মার্ক জার্মান। বিয়ের আগে আমরা দুবছর একসাথে থেকেছি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। মার্ক ও চায়না আমাদের দুজনের ভেতর আর কেউ আসুক। যদি কখনো আমাদের সন্তানের অভাববোধ হয় তবে আমরা দত্তক নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি। এই। আমার শরীরে আরেকটা প্রাণের জন্ম দেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারিনা।"

 " আচ্ছা জেসিকা, তোমার কি মনে হয় অবচেতন মনে তোমার মায়ের ব্যাপারটা তোমার মধ্যে এমন শক্তভাবে গেঁথে আছে যে তোমার ভয় হয় তুমিও তোমার সন্তানকে ফেলে রেখে চলে যাবে? আর এজন্যই তুমি মা হতে চাওনা?"

" জানি না। কে জানে? হবে হয়তো বা।" আনমনে উত্তর দিল ও।

এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল। কথা শেষ করে আমাকে বলল, " মার্ক ফোন করেছিল। ওর ক্লাশ শেষ। আমি উঠছি সুমাদ্রি। তোমার সাথে দেখো কত কথা বলে ফেললাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ সময়টুকু দেওয়ার জন্য। আর হ্যাঁ, তোমাদের নদীর দেশ দেখতে একদিন অবশ্যই যাব। তখন তোমার কথা মনে পড়বে আমার।" এই বলে সে উঠে পড়ল। আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, " ভাল থেকো। মার্ককে আমার শুভেচ্ছা জানিও।" জেসিকার চলে যাওয়ার দিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সামনের ছোট্ট দেবশিশুগুলোর ছুটোছুটি আর হুল্লোড়ে মুখরিত হয়ে উঠছিল বিকেলের পার্কটা।

সিলভা


সিলভার মুখে সেই তেজ আমি আর দেখতে পাইনা। ওকে দেখলে এখন ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া কোন কুটিরের কথা মনে পড়ে।

অথচ এই সেদিনও এই চেহারাতে কী দীপ্তিটাই না ছিল। আমার সাথে দেখা হলেই সলাজ হাসি দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করত। আর আমি ওকে আরও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করতাম, তোমার বান্ধবীর কী খবর? বিয়ে করছ কবে? আমাদের ক্যাম্পের পাশেই ওদের গ্রাম কাসিয়াপ্লু। ক্যাম্পের ছোট্ট হাসপাতালটাতে মঙ্গলবার যখন আশে-পাশের গ্রাম থেকে রোগীরা এসে ভীড় করে, সিলভা  তখন দোভাষী হিসেবে কাজ করে আমাদের ডাক্তার স্যারের সাথে, বিনিময়ে আমরা তাকে দিই মুরগীর মোটা চামড়া যেটা দিয়ে তার মা রাতের খাবারের জন্য একটা সস তৈরী করে। ছাব্বিশ বছরের সমর্থ যুবক হিসেবে পরিবারকে এর চেয়ে বেশী কিছু সাহায্য করতে না পারায় বেচারা সবসময়ই কুন্ঠিত হয়ে থাকে।

ছোটখাটো গাট্টা-গোট্টা গড়নের ছেলেটার বুদ্ধির আভাস পাওয়া যায় ওর কথা-বার্তায়। মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে দূরের কোন গ্রামের পথে গেলে আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাও। ওর সাথে দেখা না হলে অন্য সবার মত আমিও হয়তো ভাবতাম এই জংগলাকীর্ণ প্রত্যন্ত আফ্রিকান গ্রামে আর যাই থাকুক সভ্য মানুষের দেখা হয়ত মিলবেনা। সিলভা আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমার মানসও আসলে বর্ণবাদী সংস্কৃতির ছায়ায় ঢাকা। একদিন ওর গ্রামে কী একটা কাজে গেলে ওর বাড়িতে একটা ঢুঁ মারি। সাধারণ আফ্রিকান বাড়িগুলো দেখেছি একটু অপরিচ্ছন্ন হয়। কিন্তু সিলভাদের ছোট্ট বাড়িটার সবখানে রুচির ছাপ। আমাকে ও দেখাল তার ছোট্ট ঘরটা, ওর বইয়ের তাক, ছবি আঁকার খাতা। মানিব্যাগ থেকে বের করে দেখাল ওর বান্ধবীর ছবি। একটা ঝর্ণার পাড়ে তোলা ছবি। ওকে আবারও একটু লজ্জ্বা পাইয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম, বাহ, বেশ মিষ্টি দেখতে তোমার প্রেমিকা। তো, বিয়েটা করছ কবে তোমরা? মুখে সেই লাজুক হাসিটা টেনে সিলভা বলেছিল, খুব শীঘ্রই। সামনেই আমাদের দেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা। আমি জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওর আত্মবিশ্বাস দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। তাই বলেছিলাম, ধর যদি তুমি চাকরীটা না পাও, আহা ধরই না, চাকরীতো আর আভোকাদো ফলনা, তাও আবার প্রথম শ্রেণীর সরকারী চাকরী, তখন তোমার প্রেমিকার হাত বদল হয়ে যাবেনাতো আবার? কথাটার কী বুঝল সে কে জানে, আমাকে সরাসরি বলেছিল, দেখ আমি বুদ্ধিমান ছেলে, চাকরী আমার না হয়ে যাবে কোথায়? ভেবনা, তুমি আফ্রিকান বিয়ে দেখে যেতে পারবে।

আইভরী কোস্টের রাজধানী আবিদজানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে সিলভা। আবিদজানের গল্প ওর কাছ থেকেই শোনা। কাসিয়াপ্লু গ্রামে জন্ম হলেও ও বেড়ে উঠেছে এই শহরে। ও বলত, আবিদজান গেলে তোমার খুব ভাল লাগবে। জানোতো এ শহরকে আফ্রিকার প্যারিস বলা হয়। চারদিকে শুধু লেগুন। বড়, বড় সব দালান। দক্ষিণ থেকে ভেসে আসে আটলান্টিকের নোনা হাওয়া। তোমাকে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে নিয়ে যাব সুযোগ পেলে। আবিদজান আমি গিয়েছিলাম ঠিকই কয়েক মাস পর, তবে জৌলুসের বদলে এ শহর আমাকে তখন উপহার দিয়েছিল ধ্বংসস্তুপ আর পোড়া মানুষের গন্ধের বিভৎস এক ছবি। এর লেগুনগুলোতে ভেসে যেতে দেখেছি পেটফোলা মরা মানুষের পচা লাশ।

প্রায়শই ও আমাকে বলত, জানো, ফ্রান্স আমাদের দেশটাকে কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবেনা। তোমরা জানো ফ্রান্স হল শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি। ফরাসী দার্শনিকদের বুলি তোমাদের অনুপ্রাণিত করে। অথচ আমাদের দেশটাকে এখনও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রেখে, আমাদের টাকায় ওরা শিল্পোন্নত, সুপার-পাওয়ার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের সমস্ত সমস্যার মূলে কোথাও না কোথাও ফ্রান্সের দুষ্ট হাত লুকোনো থাকে। আমি একটু আহা-উহুঁ করলে ও সুন্দরভাবে আমায় বুঝিয়ে দিত আফ্রিকাকে কীকরে নানা কৌশলে এখনও শোষন করে যাচ্ছে ফ্রান্স। তারপর মুখে একটা দৃঢ় প্রত্যয়ের ভাব এনে সে বলত, তবে দেখ, একদিন আমরা মাথা তুলে দাঁড়াব।

তারপর আইভরী কোস্টে শুরু হল নির্বাচনোত্তর সহিংসতা। বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে একের পর এক শহরের পতন ঘটতে থাকল। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে লেগে গেল নৃশংসতম গৃহযুদ্ধ। দুয়েকুয়ে নামক ছোট্ট শহরে এক রাতেই অনেকগুলো গ্রাম পুড়েছে। গুরো জাতিগোষ্ঠীর হাতে গোনা কজন লোকই সে রাতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল গভীর অরন্যে। আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখেছি সে বর্বরতার চিত্র। আর আবিদজানে বিদ্রোহীরা পৌঁছানোর পর শুরু হল ভয়াবহ যুদ্ধ। আল-জাজিরায় সে যুদ্ধের নিয়মিত ঘটনা পরিক্রমা দেখে আমরা শিউরে উঠতাম। আফ্রিকার প্যারিস আবিদজান তখন যেন একটা মৃত্যুপুরী। এখানে ওখানে পড়ে থাকত লাশ। আর সমস্ত দোকান-পাট ঘর বাড়িতে চলেছে লুঠতরাজ আর ধ্বংসযজ্ঞ। সে কদিন বিভিন্ন কাজে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে সিলভার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর আমি ছুটিতে চলে এলাম ফ্রান্সে। আহা ফ্রান্স- ছবির দেশ, কবিতার দেশ! সিলভার কথা তখন আমি বেমালুম ভুলে গেছি।

মাসাধিককাল ইউরোপে কাটিয়ে যখন আইভরী কোস্টে ফিরে এলাম তখন আফ্রিকা আর আমার মনে ধরেনা। কাজে মন বসেনা। মন পড়ে থাকে ভেনিসের গোলক ধাঁধাময় রাস্তায়। মাদ্রিদের পুরোনো চত্বরগুলোতে। অস্ট্রিয়ার রাজপ্রাসাদের এখানে ওখানে। প্যারিসের বড় বড় মিউজিয়ামগুলোতে। কদিন এভাবে যাওয়ার পর গা ঝাড়া দিয়ে আবার শুরু করলাম কাজ। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে যাওয়া। কী একটা কারণে হঠাৎ কাসিয়াপ্লু যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সেদিন সিলভার কথা মনে পড়ল। খবর দিয়ে ওকে আনালাম। ওর সেই হাসিখুশী চেহারাটা দেখতে পেলাম না। ওর দীপ্তিময় চোখদুটোতে দেখলাম বিষাদ। পরিবেশটা একটু হাল্কা করার জন্য আমি আমার পুরোনো কৌশলটাই আবার প্রয়োগ করলাম। বললাম, কী খবর সিলভা? তোমার বান্ধবীর কেমন আছে? বিয়েটা হচ্ছে তো? সিলভার চেহারায় কোন পরিবর্তন এলোনা, বরং মাথাটা নীচু করে থেকে কিছুক্ষণ পর আমায় বলল, আমায় কী যেন কাজে ডেকেছিলেন? সিলভার বিষন্ন চোখ দুটোতে জলের আভাস বেশ টের পেলাম। ওর কাজটা ওকে বুঝিয়ে দিতেই ও আসি বলে চলে গেল। আমি ঠিক বুঝতে পারলামনা আমার কোন কথাটা ওকে এমন কষ্ট দিতে পারে।

দুদিন পর সিলভার বন্ধু হেনরী আমার কাছে এলে ওকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা তোমার বন্ধু হঠাৎ কী হল? অমন চুপ মেরে গেছে কেন? ওর পরীক্ষাটার কী হল? হেনরী একটু চুপ থেকে বলল, আপনি কিছু শোনেননি? বললাম, না, কেন কী হয়েছে?

-          ফাতু, মানে সিলভার বান্ধবী গুরো সম্প্রদায়ের। দুয়েকুয়েতে ওদের গ্রামটাতে যেদিন রেবেলরা হামলা চালায়, ফাতু সেদিন গ্রামেই ছিল। ওর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা সেদিনের পর থেকে। আপনি বুঝতেই পারছেন ওর ভাগ্যে কী ঘটেছে। ও গ্রামের দুয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইকে কচুকাটা করেছে ওরা। তারপর থেকেই সিলভা চুপ হয়ে গেছে। আর এ গন্ডগোলে সব পরীক্ষাই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

আমি কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল সিলভার লাজুক হাসিটার কথা। আর একটা কাল মিষ্টি মেয়ের ছবি যার পেছনে নেচে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট একটা পাহাড়ী ঝর্ণা।

আফ্রিকায় যখন বৃষ্টি নামে


                                                                  
  গতরাতে বৃষ্টি হল পাগলের প্রলাপের মত অবিশ্রান্ত।আফ্রিকার আকাশ বাংলার আকাশের মত সুনীল হলে কি হবে,এর অভিধানে অভিমান শব্দটি নেই।তাই এখানের বৃষ্টি দেখে একবার ও মনে হয়না আকাশের আজ মন খারাপ। মনে আছে যখন আসি এখানে তখন এক কাল বন্ধুকে বেশ গর্বভরে বলেছিলাম আমি বর্ষার দেশের মানুষ। বৃষ্টির জল আমাদের হৃদয়ের ভাষা বোঝে।কি জানি কি ভেবে বন্ধুটি আমার হেসে বলেছিল আফ্রিকার বর্ষা অতোটা রোমান্টিক নয়।এখানের প্রকৃতির সাথে আমাদের শ্যামলিমার অনেক মিল থাকলেও বৃষ্টি-প্রেমের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কদম ফুলের গাছ কোথাও চোখে পড়লনা এ কমাসে।আহা কদম ফুল!পৃথিবীতে অমন সুন্দর ফুল কটি ফোটে বর্ষাকালে।মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে চারপাশের পাহাড় থেকে যখন ভেসে আসত বুনো কদমের মায়াবী গন্ধ তখন জন কীটস পড়াতে আসা শিক্ষকটি ও হঠাৎ যক্ষের মত বিরহী হয়ে উঠতেন।পৃথিবীর অন্য ভাষায় বর্ষাবন্দনা অমন করে কি হয়েছে কোনকালে?

  রাতে বৃষ্টি হলে তারপরদিন সকালে ক্যাম্পের সামনের পাহাড়ে নেমে আসে মেঘের দল।সে এক অপূর্ব,অপার্থিব দৃশ্য।যেন মনে হয় পাহাড়গুলোকে সান্ত্বনা দিতে আসে ওরা,কিংবা অন্য আকাশের অন্য পৃথিবীর গল্প,ঘ্রাণ নিয়ে আসে ওদের কাছে।এই যে পাহাড়গুলো কার অভিশাপে কত হাজার বছর ধরে মাটির সাথে আটকে পড়ে আছে কে জানে,তাদের জন্য ভারী মায়া হয় মাঝে মাঝে।প্রখর রোদে তারা জ্বলে পুড়ে যায়,দূর্দান্ত হাওয়া তাদের শরীর ছিঁড়ে দেয় আর বৃষ্টির প্রচন্ডতার মাঝে তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে বিদ্যুতের নকশা দেখে আকাশে।লাবণ্য শব্দটা ঠিক মানায়না এ বর্ষার জন্য।যখন আসি এ দেশে তখন মাঝে মাঝে আকাশে আসতেন 'হারমাটান'।লাল ধূলায় আকাশ ঢেকে ফেলে দানবের মত হুংকার ছাড়তে ছাড়তে তিনি ছুটে যেতেন গ্রাম,শহর আর সাভানার ওপর।আচেবির গল্পে পড়েছি পঙ্গপালের ঝাঁকের আকাশ ঢেকে ফেলার কথা।হারমাটানের কবলে পড়লে আমাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝরত,তাই পরবর্তীতে যখনই আকাশে লাল ধূলোর মেঘ দেখতাম আমি ভোঁ দৌঁড় দিয়ে ফিরে আসতাম আমার রুমে,তারপর ঝড় থেমে গেলে খোঁজ নিতাম কার নাক দিয়ে কতটুকু রক্ত ঝরল।

বাংলার বৃষ্টির সাথে অদৃশ্য নুপুরপরা অপ্সরারা নাচে।কান পাতলেই শোনা যায় ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম।গ্রামে টিনের চালে একটা মধুর শব্দ হত,ঝোপ থেকে,ডোবা থেকে অবিরত ব্যাঙেরা প্রণয়গীত গেয়ে যেত।আমরা তখন মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক দৌঁড়ে উঠোন পেরিয়ে চলে যেতাম আম বাগানে,তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে আসতাম ঘরে দুপকেট ভরে কাঁচা আম নিয়ে।কখনো কখনো শিলাবৃষ্টি হলে মা বলতেন, আকাশের ওপারে যে দুষ্টু ছেলেদের দল আছে তারা আমাদের হিংসে করে বরফের ঢিল ছুঁড়ে মারছে।তখন ভেবে কূল পেতামনা ওই সব দুষ্টু ছেলেদের সাথে আমাদের কিসের শত্রুতা।মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শুনতাম,

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

এরকম বর্ষামেদুর দিনে কখনো স্কুলে যেতে না হলে,ঘরে বাবা থাকলে আমি দোতলার একলা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি আকাশ দেখতাম আর ওপারের দুষ্টু ছেলেদের খুঁজে বেড়াতাম। তখন চোখে পড়ত রজনী জেঠা মাথায় জোঁইর চাপিয়ে বিলের কিনারে ঘাস কাটছেন, ওপাড়ার নীলু ইয়া বড় কচুপাতাকে ছাতা বানিয়ে মাথার ওপর ধরে ঘরে ফিরছে,আর চারদিকে সেই অমোঘ সংগীত।ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম। এ সুর বহুদূরের ওপার থেকে ভেসে আসা সুর।

এখানের বৃষ্টি যেন হুংকার ছাড়ে,আমার প্রিফ্যাবের ছাদে দুমদাম কিল বসায়।ভেকেদের গীতে প্রণয়ের লেশমাত্র ও নেই।আমি খুব আশা করে বসে থাকি কোথাও বাজবে মেঘ রাগ কিংবা রবীন্দ্রনাথের গান।বৃষ্টিতে ভেসে আসে বৃশ্চিক আর সাপ।আতঙ্কে আমরা রুমে নিজেদের বন্দী করে রাখি।আমাদের পোষা হরিণ দুটো মায়াময় চোখে ভিজে যেতে থাকে।জলের তোড় মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে যেতে একটা ধারা তৈরী করলে আমার কাগজ দিয়ে নৌকা বানাতে খুব ইচ্ছে করে।ছোটবেলায় এভাবে আমি পাড়ি দিতাম সাগর-মহাসাগর।জানিনা কোন অদ্ভুত কারনে বৃষ্টি এলেই শৈশবটা স্মৃতি থেকে লাফিয়ে পড়তে চায় যৌবনের আঙিনায়।

গতকাল সারাটা রাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হল।এটা বর্ষাকাল শুরুর পূর্বাভাষ।এ ঋতুতে এখানে আকাশ ভেঙে ভেঙে পড়ে।কখনো কখনো টানা এক সপ্তাহ।সকালে দেখলাম মেঘগুলো নেমে এসেছে পাহাড়ের কোলে।হয়তো নতুন কোন পৃথিবীর নতুন কোন গল্প নিয়ে।আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করে মেঘ রাগ কিংবা মায়ের কন্ঠ-

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১১

আফ্রিকার প্যারিস- আবিদজান
























   প্যারিস-কে বলা হয় শিল্পের নগরী,সৌন্দর্যের দেবী যেন এ শহরে অধিষ্ঠাত্রী হয়ে আছেন।২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বোমারু বিমানগুলো ইউরোপের বড় বড় শহরকে ভূলন্ঠিত করলে ও প্যারিসের উপর কী এক অদ্ভুত কারণে তারা বারুদের ছোঁয়া ও লাগায়নি।২০০৮ সালের শরতে প্যারিস-কে দেখে বুঝেছিলাম কোন দৈববলে দেবী নাজীদের পাষান হৃদয়ে ও সুরের ঝংকার তুলেছিলেন।আফ্রিকা মহাদেশের এককোনায় ও শুনেছিলাম ছোট্ট একটা প্যারিস আছে কিন্তু তার নাম ভিন্ন।আবিদজান।খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম,আবিদজান আইভরী কোস্ট নামক একটা সাবেক ফরাসী উপনিবেশের রাজধানী।ফরাসীদের যখন উপনিবেশ তখন হয়ত ব্যাপার একটা আছে,মনে মনে ভেবেছিলাম।তখন কল্পনাও করিনি বছর তিনেক পর সেই উপনিবেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে জাতিসঙ্ঘের একটা চাকরী নিয়ে আমি কাজ করতে আসব দীর্ঘদিনের জন্য।আইভরী কোস্ট-এর প্রত্যন্ত একটা মফঃস্বল শহরে যখন ধুলিমাখা হয়ে আসি,তখন সেখানে রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে।প্রায় দশ বছর ধরেই দেশটা ভাগ হয়ে আছে দুভাগে,সরকার সমর্থিত দক্ষিণভাগ আর বিদ্রোহীদের দখলে থাকা উত্তরভাগ।আমি এসে দেখলাম আফ্রিকার প্যারিস আমার সেই মফঃস্বল শহর থেকে ৮০০ মাইল দূরে,আর বরাতে আমার পড়েছে বিদ্রোহীদের কব্জায় পড়ে ধুঁকতে থাকা দক্ষিনের শহর মঁ।যদিও মঁ শান্ত,পাহাড়ী,মেঘের আঁচলে লুকিয়ে থাকা সুন্দর একটা জায়গা; আমার মনপাখি বারবার উড়ে চলে যেতে চাইত আফ্রিকার প্যারিসের আকাশে।কে জানে কেমন ঐ শহরটা,তার মাঝখানে ও কি আইফেল টাওয়ারের মত কিছু আছে কিনা,কিংবা তার নদীর উপর যে সেতুগুলো আছে সেখানে শিল্পীর দল তুলি আর ক্যানভাস নিয়ে সারাদিন ছবি আঁকায় মগ্ন থাকে কিনা,এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমি অস্থির হয়ে পড়তাম।এভাবেই কেটে গেল চারটি উষ্ণ মাস।এই চার মাসে আবিদজানে মরেছে বিস্তর মানুষ,আন্তর্জাতিক মহলের খবরদারী আর চোখ রাঙ্গানিকে উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে আবিদজানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন  উপনিবেশ-বিরোধী,স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট লরেন্ট বাগবো।এইখানে কিছুটা পরিপ্রেক্ষিত দিয়ে রাখা ভাল।দীর্ঘকাল ফ্রান্সের উপনিবেশ থাকার পর ১৯৬০ সালে আইভরী কোস্ট স্বাধীনতা লাভ করে কিন্তু আজ পর্যন্ত নেপথ্যে থেকে এই দেশের উপর খবরদারি চালিয়ে যাচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের আবছায়ায় নিজেকে আড়াল করে রাখা সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্স।এই দেশের সমস্ত খনিজ সম্পদ তুলে নিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানীগুলো কোন রকম রাজস্ব না দিয়েই।এই দেশের চিরহরিৎ বনগুলোকে উজাড় করে দিচ্ছে লেবানীজ আর ফরাসী বনদস্যুরা।প্রধান কৃষিজ দ্রব্য কোকো আর কফি এদেশ থেকে নামমাত্র মুল্যে কিনে নিয়ে বাজারজাত করছে ফ্রান্স-এ আর ফ্রান্স থেকেই চালান যাচ্ছে সারা বিশ্বে।এদেশের বিদ্যুত,পানি এবং টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থার মালিক হল ফ্রান্সের বিভিন্ন ক্ষমতাধর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। অবাক হলে ও সত্যি এদেশের ভেতরই বিশাল এক এলাকা জুড়ে রয়েছে ফ্রান্সের ক্যান্টনমেন্ট। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লরেন্ট বাগবো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন ২০০০ সালে,আর ঠিক তার দুই বছর পরই ক্যুর মাধ্যমে দেশটির উত্তর অংশ দখল করে নেয় সেনাবাহিনীর একটা অংশ।নিজেদের এরা রেবেল পরিচয় দিতেই ভালবাসে। প্রধানত মালি,বুরকিনা ফাসো,গিনি,ঘানা এসব দেশের অভিবাসীরাই বিদ্রোহীদের দল ভারী করে তোলে। এবং স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্স এই সুযোগটা লুফে নেয়,বাগবো সরকার সবসময় অভিযোগ করে এসেছে যে ফ্রান্স গোপনে বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে,অস্ত্র এবং অর্থের যোগান দিয়ে। দুবছর যেতে না যেতেই ২০০৪ সালে বাগবো সমর্থক এবং ফরাসী সৈন্যদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ লেগে যায়,ফরাসী যুদ্ধ বিমান বোমা মেরে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় আইভরী কোস্ট-এর বিমান বাহিনীকে,আবিদজানে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। কয়েকমাস পর সরকার এবং রেবেলদের মধ্যে একটা শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয় জাতিসংঘের পৌরহিত্যে যার ভিত্তিতে দেশটি দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত দক্ষিনভাগ আর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত উত্তরভাগে।সেই থেকে ২০১০ সাল অবধি সবুজ এই দেশটি শান্তই ছিল,অশান্তি মাথা-চাড়া দিয়ে উঠে অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে হওয়া এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বাগবো এবং অভিযোগ তোলেন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির।উল্টো নিজেকেই তিনি বিজয়ী ঘোষনা করে বসে শপথ নিয়ে বসেন।একই সাথে আনর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসঙ্ঘের রায়ে নির্বাচিত প্রার্থী আলাসান ওয়াতারা ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে ফেলেন।আফ্রিকা-র প্যারিস আবিদজানে শুরু হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশা খেলা এবং এরই মাঝে পড়ে খুন হয়ে যায় শত শত মানুষ।আবিদজানে যখন ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে দুই প্রেসিডেন্ট এর সমর্থক এবং যোদ্ধাদের মধ্যে,তখন ৭০০ মাইল দূর থেকে বসে প্রতিদিন আমি উৎকন্ঠা নিয়ে ভাবতাম আমার আফ্রিকার প্যারিস দেখা বোধ হয় আর হবেনা।প্রতিদিন খবর পেতাম আবিদজানের রাস্তায় মানুষ পোড়ানো আর শপিং মল গুলোতে লুটপাটের খবর।আর আমি বিমর্ষ হতাম ভেতরে ভেতরে।আবিদজান এ যখন বিদ্রোহী বাহিনী ঢুকে পড়ে,আর জাতিসঙ্ঘ আর ফরাসী সৈন্যরা যৌথভাবে বিমান হামলা চালায়,বিশাল এ শহর তখন যেন একটা মৃত্যুপুরী।এখানে ওখানে লাশের পাহাড়,আর মানুষ পোড়ার গন্ধ,আর রক্তের দাগ,আর ভয়।ভয়।উত্তরে থেকে তখন আমরা দেখছি অমানবিক জাতিগত সহিংসতা,আবিদজান থেকে উৎখাত হওয়া মানুষের ঢল,আর মানুষের চোখে অবিশ্বাস আর ঘৃনা।দুয়েকুয়ে নামক একটা শহরে একদিনেই খুন হয়েছে হাজারো মানুষ।লাশের গন্ধ যে কী বিবমিষাকর তা এই প্রথমই আমার টের পাওয়া।শেষ পর্যন্ত সিংহপুরুষ বাগবোকে যখন গ্রেফতার করা হল তার প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ থেকে,তখন উত্তরে খুশীর জোয়ার।রাস্তায় রাস্তায়  বর্ণিল পোষাকে সজ্জিত নারীদের মিছিল। আবিদজানে ঢোকার পথে এখন আর কোন বাধা নেই।

বাগবো'র পতনে আমি যে খুশি হয়েছি এমন নয়,বরঞ্চ তার প্রতি সবসময় একটা সহানুভূতিই টের পেয়েছি ভেতরে ভেতরে।কিন্তু আমি আদার ব্যাপারী।আমার খুশি-অখুশিতে পৃথিবীর অন্যায় থেমে যাবেনা।আমি বরং আবিদজান দেখতে পাবো এজন্যই পুলকিত।এর মাস খানেক পরই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।বিমান থেকে আবিদজানের যে ছবি আমি দেখতে পেলাম তাতেই আমি মোহিত।এটা একটা লেগুনে ঘেরা বিশাল শহর।আবিদজানে পা রেখেই আমি অবাক হলাম নগরবাসীর কর্মচাঞ্চল্য দেখে।কে বলবে এ শহরেই মাত্র কদিন আগে হাজারো মানুষ গুলি খেয়ে মরেছে।আবিদজানে সড়কে গাড়ির ঢল দেখে ও অবাক হলাম।আসলে দীর্ঘ দশ বছর ধরে এ দেশটা একটা সংকটে আছে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চাইবে এটার অবসান হোক।মানুষগুলোর চেহারায় ও তাই ক্লান্তির ছাপ।আবিদজান ফরাসীদের হাতে গড়া শহর।এর লেগুনগুলোর উপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটো সেতু অনেকটা সীন নদীর ওপরের সেতুগুলোর মতই।যুদ্ধের সময় এই লেগুনগুলোতে নাকি ভেসে যেত মানুষের লাশ।সারাটা শহরে দেখলাম ফ্লাই ওভারের ছড়াছড়ি,এ শহরে একবার রাস্তা হারালে নতুন ড্রাইভারের যে কি হাল হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।আবিদজানের সুউচ্চ দালানগুলো সব ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান।মূলত ফরাসীরাই এসব ব্যাবসার মহারথী,মিডলম্যান হিসেবে আছে লেবানীজরা।আইভরীয়ানরা এসব অফিসে চাকরী করে।শহরের অফিস পাড়ার নাম প্লাতো,এখানেই রয়েছে ফ্রান্সের দূতাবাস,স্টেডিয়াম,ব্যাংক আর শপিং মলগুলো।সন্ধ্যায় আমরা কদিন পিজ্জা খেতে গেছি রেস্টুরেন্ট পাড়া জোন ফোর-এ।আবিদজানের একটা ব্যাপার দেখে খুব ভাল লাগল,তা হল এরা মোটামুটি আইন মেনে চলা পাবলিক।গাড়ীগুলো চলছে সারিবদ্ধভাবে।লালবাতি পড়লে থেমে যাচ্ছে।এখানে ওখানে ময়লার স্তুপ ও নেই।এ শহরের বনেদী পাড়া হল কোকোদী।এখানেই প্রেসিডেন্ট বাগবোর বাসা।এখানেই আবিদজানের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়।এখানেই সব অভিজাত লোকেদের বাস।কোকোদীতে আমরা প্রায়শঃ বেড়াতে যেতাম আবিদজানের সত্যিকারের চেহারা খুঁজে পেতে।শহরের উপকন্ঠে রয়েছে আবিদজানের সৈকতগুলো।আটলান্টিকের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রান্ড বাসাম,বা আশ্বিনি সৈকতে এখন পর্যটকের কোন কোলাহল নেই।এখানে সৈকতগুলো মারাত্মক রকমের ঢালু,আর স্রোতের সে কি টান,আমাদের কক্সবাজার সে তুলনায় ঢের মনোরম।তবে গ্রান্ড বাসাম সৈকতের মূল আকর্ষন তার শিল্প বাজার।আইভরীয়ানদের কাঠের কাজ অতুলনীয়।মূলতঃ সেনুফু সম্প্রদায়ের লোকেরাই এই পেশার সাথে জড়িত।বাজার জুড়ে সারি সারি দোকানগুলো আমার কাছে এক অন্য পৃথিবীর রুপ তুলে ধরছিল যেন।প্রতিটি দোকানই আমার কাছে মনে হচ্ছিল এক একটা মিউজিয়াম যেখানে মূর্ত হয়েছে আফ্রিকানদের সৌন্দর্যবোধ,তাদের বীরত্মগাঁথা,তাদের দৈনন্দিন জীবনের সহজিয়া কথকথা।আবিদজানের আকাশচুম্বী দালান আর রাস্তাঘাট আমাকে একটা পরিকল্পিত শহরের ধারনা দিলেও সাগর পাড়ের শিল্পের এই দোকানগুলো-ই আমাকে এ শহরের খ্যাতির রহস্য বলে দেয়।প্যারিসে ও সীন নদীর ওপর শিল্পীরা বসে এঁকে চলে ঠিক যেভাবে সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে সেনুফু তরুন ছেনি দিয়ে ইরোকো কাঠের ওপর ফুটিয়ে তোলে আফ্রিকার ছন্দগাঁথা।এখানেই আবিদজান আর প্যারিসের মধ্যে আমি দেখতে পাই এক অভূতপূর্ব মিল।

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১

মায়াময় গ্রোনব্ল।












 শঁবেরী( chambery)  স্টেশনে নেমেই শুনলাম ঝামেলা। গ্রোনব্ল( Grenoble) যাবার ট্রেনরুটে নাকি কাজ চলছে। তো কী হবে এখন? " ঘাবড়ানোর কিছু নেই মঁসিয়ু, আপনাদের জন্য আমাদের বিশেষ বাস-সার্ভিস আছে, আসুন আমার সাথে।" কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো সদাশয় অফিসারটি অভয় দিয়ে বললেন। যাক, আমিতো ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম। বাসে উঠতে না উঠতেই ড্রাইভার এস্কেলেটরে পা দিল, হুমড়ি খেয়ে পড়লাম সুইস তরুনীটির ওপর (আলাপচারিতায় পরে জেনেছিলাম), মুমুকে বিদায়ও জানাতে পারলাম না ভাল করে, যেন আমার অপেক্ষাতেই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল দোতলা গাড়িটা।

   যাত্রাপথ দুঘন্টার। ইতালী সীমান্তবর্তী ফরাসী শহর গ্রোনব্ল। আল্পস পর্বত দিয়ে ঘেরা মনোরম উপত্যকার উপর গড়ে উঠেছে এ শহর। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ডরোথী আর ফ্রঁসোয়া থাকে এখানে। গেল বছর দেশেই ফ্রঁসোয়ার সাথে দেখা হলেও ডরোথীর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ঠিক পাঁচ বছর আগে। গ্রোনব্ল-এ যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য তাই বন্ধু দর্শন, তবে ফাঁকতালে শহরটাও ঘুরে ফেলা যাবে এটাও ছিল মনে।

 গ্রোনব্ল-কে বলা হয় আল্পসের রাজধানী। মূলতঃ তিনটি বিশাল পর্বতশ্রেণী শার্তোজ, ভের্কোস আর বেলদোন এর মাঝখানে চুপটি মেরে বসে আছে এ শহর যেখানে এসে মিলেছে দ্রাক আর ইজের নদী। ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে এ শহরের রয়েছে বেশ খ্যাতি। আর ফরাসী বিপ্লবের মশালটাতো জ্বলেছিল সর্বপ্রথম এ শহরেই। এরকম অনেকগুলো কারনেই এ শহরটা বেশ পরিচিত পর্যটক মহলে। বিশেষকরে স্কি খেলোয়াড়দের স্বর্গরাজ্য এই গ্রোনব্ল, শীতে যখন পাহাড়গুলো বরফের পুরু আস্তরনে ঢেকে যায়, তখন তাদের চূড়া থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে দুঃসাহসী স্কি-বাজেরা।

শঁবেরী থেকে গ্রোনব্ল আসার পথটা ভীষণ সুন্দর। ইউরোপীয়ান বিশাল হাইওয়ে, সোজা চলে গেছে ইতালী। রাস্তার দুপাশ জুড়ে কখনও যবের ক্ষেত, কখনও সূর্যমুখীর বাগান, কখনও বা ছোট ছোট বন।  পুরো ফ্রান্স জুড়েই দেখলাম খালি ক্ষেত আর সবুজ বনাঞ্চল। প্রতি ছয় বছর অন্তর এক একটা জায়গার এরকম ছোট বনাঞ্চলগুলো সরকার কেটে ফেলে গাছগুলোকে বিভিন্ন কাজে ব্যাবহার করার জন্য। বনায়ন শুরু হয়ে যায় সাথে সাথেই, পরবর্তী ছয় বছরের ভেতর যখন আবার এখানে ছোট একটা বন তৈরী হচ্ছে, সরকার তখন অন্য জায়গা পরিস্কার করার কাজে ব্যস্ত।  গ্রীষ্মের মধুর বিকেল পড়ে আছে ইউরোপের মাঠে মাঠে।ক্ষেতে ক্ষেতে দেখলাম চাকার মত গোলাকার সব খড়ের গাদা।আমার ফরাসী ভাষার শিক্ষক গুরুপদ চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে যায় তখন। ইউরোপের গ্রামের দিকটা কেমন জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু বলতেন, “ জাস্ট লাইক পিকচার।” বাসের জানালাটাকে আমার কাঁচের ফ্রেম মনে হয়। মনে হয় যেন কোন চলন্ত ছবি দেখছি।
দুঘন্টা যে কোনদিকে ফুরুৎ করে উড়ে গেল টের পেলাম না। হঠাৎ দেখলাম বাস ঢুকে পড়েছে একটা শহরে। গ্রোনব্ল। ডরোথীকে জানালাম মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আসছি। একেকটা জায়গায় বাস দাঁড়ায় আর আমি উৎসুক চোখে বাইরে তাকাই পরিচিত মুখটাকে খুঁজে পাব বলে। আমার সহযাত্রী তরুনীটি আমায় জানাল আমাদের শেষ গন্তব্য শহরের ট্রেন স্টেশন। স্টেশনে নেমে কাউকেই খুঁজে পেলামনা। না ফ্রঁসোয়া, না ডরোথী। ফোনও ঢুকছে না। একবার এদিকে যাই, আবার উলটোপথে হেঁটে আসি। হঠাৎ শুনলাম পেছন থেকে কে যেন চিৎকার করছে, " সুমাদহী, এ ও, সুমাদহী!" ঘুরতেই দেখি সেই দুষ্টুমিতে ভরপুর হাসিমাখা মুখ। না চেহারা একটুও বদলায়নি এ পাঁচ বছরে। শুধু ওজনটা কমে গেছে। স্বাভাবিক পাঁচ বছর আগের ছাত্রীটা এখন জাঁদরেল উকিল হয়ে গেছে যে। জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে বললাম," এক্সকিউজে-মোয়া মাদমোয়াজেল, নামটা সুমাদ্রী, তোমার ফরাসীটা উচ্চারণটা বড় কানে বাজে।" [ ফরাসীতে 'র' এর উচ্চারণটা বড় বিদঘুটে, 'হ' এবং 'খ' এর মাঝামাঝি একটা উচ্চারণ।]

 ডরোথীর বাসায় ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম। ফ্রঁসোয়া থাকে শহরের কেন্দ্রে।[ এরা বলে সন্তহ দ্য ভিল]। ওর বাসার ঠিক নীচেই কয়েকটা রেস্তোরাঁ। ফ্রান্সের রেস্তরাঁগুলোর বাইরে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে সাজানো থাকে চেয়ার টেবিল, সবাই গ্রীষ্মের মিষ্টি রোদ গায়ে মাখাতে চায়। আমি বাপু ছয় মাস আফ্রিকায় ঢের রোদ খেয়েছি। তাই টেরাসের যে জায়গাটায় একটু ছায়া আছে দেখলাম ওখানটাতে গিয়েই আমরা বসলাম। কিছুক্ষন পর ফ্রঁসোয়া আর ওর বান্ধবী নাতালি এসে যোগ দিল আমাদের সাথে। ফ্রঁসোয়া সাথে নিয়ে এসেছিল ফরাসী একটা ফল " প্রুন"। বেশ মিষ্টি স্বাদ। তারপর এই কথা, সেই কথা। কথার আর শেষ হয়না। একটার পর একটা টোস্ট চলতেই থাকল। ডরোথী আবার এলকোহলের ধারে কাছেও যাবেনা। ঘুরে ফিরে ও কী একটা ফলের রসই চাখছিল দেখলাম। গ্রীষ্মের এই এক মজা। সূর্য ডোবে রাত নটায়। রাত সাড়ে নটা পর্যন্ত আড্ডা মেরে অতঃপর উঠলাম। পরদিন সবাই আবার ভোরেই কাজে ছুটবে।

ফেরার পথে ডরো আমাকে শহরটা একটু ঘুরিয়ে আনল।

গ্রোনব্লে ছিলাম সবমিলিয়ে তিন দিন। ঘোরাঘুরি বলতে তেমন কিছুই হয়নি। আমার বন্ধুগুলো দিনের বেলা ভীষম ব্যস্ত। উকিল চলে যায় কোর্টে আর গলা ফাটিয়ে জজকে বলে, " আপনি এর বিচার করুন বিজ্ঞ বিচারক।" ফিজিওথেরাপিস্ট ফ্রঁসোয়া ক্লিনিকে রোগীদের ম্যাসাজ করতে করতেই কাহিল হয়ে গেল। আমি করি কী? দিনটা ইয়া লম্বা। গ্রোনব্লের যাদুঘরে গেলাম একদিন। ফ্রান্সের প্রতিটা শহরের যাদুঘরগুলো দেখার মত। পুরো দুনিয়ার ইতিহাসটাকে এরা নগরবাসীর জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য এনে হাজির করেছে এখানে। কী নেই এতে? মিশরের মমি থেকে শুরু করে মাতিসের ছবি। ডরো একটা ম্যাপ দিয়েছিল শহরের যাতে আমি পথ হারিয়ে না ফেলি। বেশ কাজ দিয়েছিল ওটি। শহরের প্রধান আকর্ষন ইজের নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শত বছরের পুরোনো দূর্গ বাস্তিই। দুভাবে ওখানটাতে যাওয়া যায়। পায়ে হেঁটে, ট্র্যাক করে। অথবা ক্যাপসুল ট্রামে চড়ে।  আমি কোনটা বেছে নেব ভাবতে ভাবতে আর ঠিক করতে পারলাম না। ইজের নামের ছোট্ট খরস্রোতা নদীটার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজা দফিন-এর পার্লামেন্ট, এখন এটিও একটি যাদুঘরে রুপান্তরিত হয়েছে।
ইজের ব্রীজ।
সময় ফুরোতে চায়না। শহরের মাঝামাঝি একটা বড় পার্কে ঢুকে পড়লাম। এখানে ওখানে রোদ পোহাচ্ছে ছেলে-বুড়োর দল। প্রেমিক-প্রেমিকাদের চুম্বনালিঙ্গন দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেল। যেখানেই বসি সেখানেই দেখি এই ব্যাপার। একা একা সঙ্গীহীন বসে থাকাটা এখানে বড্ড অস্বস্তিকর। কোথাও আবার বাঘের মত বিশাল সাইজের কুকুর। আমার আবার কুকুরে একটু ইয়ে আছে! শান্তিতে তাই কোথাও বসার জো নেই। ঘুরঘুর করতে করতে বেগ পেয়ে গেল, কিন্তু উদ্দিষ্ট জায়গাটি খুঁজে পাচ্ছিনা। ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্য এক গীটার বাদকের কাছাকাছি বসে টুংটাং শুনছি, অমন সময় শুনলাম কারা যেন বলছে, " চল, জায়গাটা তোকে চিনিয়ে দিয়ে আসি।" মাথা ঘোরাতেই দেখি একটু পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুই তরুন, আর যায় কোথায়! ছুটে গিয়ে ধরলাম। ওপারের। গ্রোনব্লে পড়াশোনা করছে। অনিকেত আর শ্বেতাভ। ওদের পিছু পিছু গিয়ে শান্তিনিকেতনের কাজ সেরে তিনজনে মিলে বসলাম ইজের এর ওপারের একটা ছোট রেস্তোরাঁয়। আর বাঙালী এক হলে যা হওয়ার তাই হতে লাগল।

দ্বিতীয়দিনও ডরো আমাকে ঘরের তালা চাবি দিয়ে কোর্টে চলে গেল। সারাদিন ঘরে আমি ভেরেন্ডা ভাজলাম। দুপুরে খাওয়ার জন্য ডরোর দুঘন্টার বিরতি। একটা রেস্তোরাঁয় বসে মজাসে একটা ফরাসী খাবার " হাবিওলা" খেলাম। ফরাসীদের খাবারের বেশ সুনাম শোনা যায়, কিন্তু আমার মসলামাখানো জিভ ওদের খাবারে কেন জানি কোন স্বাদই খুঁজে পায়না। ফরাসীরা অবশ্য খাবারের ব্যাপারে বেশ সৌখিন। প্রায় প্রতিটা শহরেই দেখেছি সারা পৃথিবীর রান্নাঘর। তবে অনেক খুঁজেও বাংলাদেশী কোন রেস্তোরাঁর হদিস পাইনি আমি কোথাও। ডরো চলে যাওয়ার পর আবার এদিক ওদিক ঘুরঘুর। শহরের ভেতরে ট্রাম চলে। ভাবলাম চেপে বসি। এমন সময় ফিজিওর ফোন, " তৈরী থেক, বিকেলে আল্পস পর্বত দেখাতে নিয়ে যাব।"

বিকেলে ফ্রঁসোয়ার সাথে এল ওর আরেক বন্ধু স্তেফানী। সাথে স্তেফানীর কুকুর লুনা। চারজনে মিলে আমরা স্তেফানীর ছোট্ট গাড়ীতে চেপে রওনা দিলাম। আমার পাশে লুনা। কিছু পরপরই কাঁইকুঁই করে গায়ে লুটিয়ে পরতে চায়। আমি একবার ধমকের মত করে বললাম, " এই কুত্তা!" ফ্রঁসোয়া বাংলাদেশে গেছে দুবার, কিন্তু এর মধ্যেই কুকুর আর কুত্তা'র মধ্যকার সূক্ষ পার্থক্যটা ভাল করেই বুঝে গেছে। আমার দিকে অভিমানী চোখ তুলে বলল," ওর নাম লুনা।" বাপরে!

পরের কয়েক ঘন্টা যেন স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম।

গাড়িটা  পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। দুপাশে সব অপার্থিব দৃশ্য। ফ্রঁসোয়া জানাল এখানে সে শীতে স্কি করার জন্য ফি বছর আসে। জায়গাটা হাইকিং এর জন্যও বেশ নামকরা। অনেককেই দেখলাম সাইকেল চালিয়ে ঘাম ঝরাতে। কী দরকার বাবা অত কষ্ট করার, একটা গাড়ী নিয়ে শোঁ করে উঠে যাও। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা ড্রাইভ করে আমরা পাহাড়ের চূড়াটাকে দেখলাম। ও গড!
গাড়িটাকে একটা সরাইখানার পাশে রেখে আমরা এবার পায়ে হেঁটে উঠতে লাগলাম। এখানে এত উপরে রোদ থাকলেও আমার হাল্কা শীত লাগছিল। লুনার সাথে ইতিমধ্যে আমার বেশ ভাব জমে গেছে। ওকে এখন আর কুত্তা ডাকতে ইচ্ছে করেনা, আদর করে ডাক দিই লুউউউউনাআআআআ। ও ছুটে ছুটে আমাদের সামনে থাকছিল। ক্যাল্কের পাথরের পাহাড়। চারদিকে মিষ্টি সবুজ রঙ। পাহাড়ী ঘাসফুল হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। নাতালির বেশ কৌতূহল বাংলাদেশ নিয়ে। সেপ্টেম্বরে ওরা দুজন আবার যাবে চট্টগ্রাম। বললাম বান্দরবান, রাঙ্গামাটি,কক্সবাজার,সিলেট ঘুরে আসতে।

চূড়ামতন জায়গাটায় গিয়ে থামলাম আমরা। এখানেই একটা ছোটখাট পিকনিক করব। এতক্ষণ হাঁটার ফলে খিদেটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল।সাথে আনা কিশ, পিজ্জা, বার্গারগুলো তাই আমরা পরমানন্দে সাবাড় করতে লাগলাম। লুনার জন্যও আনা হয়েছে স্পেশাল খাবার। কিন্তু ইশ, পানি আনার কথা কারো মাথাই ছিলনা। কী আর করা কোক দিয়ে হাত ধুয়ে, মুখ মুছে হাসতে হাসতে খুন হবার উপক্রম আমাদের। বেশ কিছুক্ষণ ফুরফুরে বাতাস খেয়ে অন্য একটা পথা ধরে নামতে লাগলাম আমরা। নীচে একটা গোচারণভূমিতে অনেকগুলো গরু ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের গলায় ঘন্টা বাঁধা। তাদের বিচিত্র ঢং ঢং শব্দে পুরো পাহাড়টা মুখরিত। কী যে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তখন। এই দৃশ্য কতবার আমি দেখেছি স্বপ্নে, টিভিতে।
এদিকে অসাবধান হয়ে চলতে চলতে ফ্রঁসোয়া মাড়িয়ে দিয়েছে গোবর। বিটকেল গরুগুলোর কোন স্যানিটারি সেন্স নেই, বলল সে। আমরা তো হাসতে হাসতে কাহিল। অবশেষে সরাইখানায় এসে একটা খালি টেবিলের দিকে আমরা এগিয়ে গেলাম। আমাদের মত আরও অনেকেই এসেছে এখানে গাড়ী নিয়ে।। বেচারী ডরোর জন্য সবাই একটু আফসোস করলাম। এমন সুন্দর বিকেল সে কিনা আসামী জেরা করে কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেকক্ষণ আড্ডা মারার পর আকাশের রঙ যখন গোলাপী হতে শুরু করল ভাবলাম নামা যাক। পাহাড়টার দিকে আবার তাকালাম। শত হোক আল্পসের একটা প্রশাখা তো! দ্বিতীয়বার কি আর আসা হবে এখানে? হঠাৎ মনটা যেন একটু উদাস হয়ে গেল।

সে রাতে ডরোথীর বাসায় বাঙালী রান্নার আয়োজন করলাম। শেফ বিশিষ্ট এই অভাজন। ভোজন চলাকালীন এবং খাওয়ার পর ওদের চোখের পানি, নাকের পানি দেখে মনে হল কোথায় যেন একটা গন্ডগোল করে ফেলেছি আমি। হেঁশেলের কাজ কি আর যেন তেন কাজ!

তার পরদিনই গ্রোনব্লের মায়া কাটিয়ে লিওঁ ফিরে এলাম। ট্রেন থেকে অনেক দূর অব্দি দেখা যাচ্ছিল আল্পসের একটা অংশ।