সেই সকাল থেকে হাঁটছি। রুম থেকে বেরুনোর আগে শুকনো দুটো রুটি চিবিয়ে এ কদিনে
চুপসে যাওয়া পেটটাকে একটু আদর করে বলেছিলাম, " এই তোর সুযোগ, এ বেলা যদি না ঝরঝরে, নির্মেদ হতে পেরেছিস তো, আর কখনোই পারবি না।" কখনো কখনো এভাবেই উদ্ভট সব প্রবোধ দিতে হয় নিজেকে।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ বোকা বানিয়ে রাখা যায় নিজেকে। গ্রান ভিয়া দিয়ে হেঁটে
মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় পার্কটার কাছে এসে পড়েছি যখন, তখন কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বাঁ পাশের ফুটপাথের উপর জুড়ে বসল একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ।
চোখ আর পেটের ভারী দোস্তি। আর যাই কোথায়! পেটের ভেতরে হঠাৎ যেন দাঙ্গা লেগে গেল। অতএব,
রেস্তোরার বাইরে ফুটপাথের ওপরেই সাজানো চেয়ার-টেবিলে বসে পড়লাম।
বেয়ারা গোছের একজন এসে প্রশ্নবোধক ভঙ্গী নিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্পেন দেশে আমি
আনপড়, স্প্যানিশ বুঝিনা। মেনুর উপর অনেকক্ষণ চোখ
বুলিয়েও যখন কিছু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না, অমন সময় নারীকন্ঠের
আওয়াজ, " তোমাকে সাহায্য করতে হবে মনে হচ্ছে?
" হতচকিত হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম বাদামী রঙা, চৈনিক চেহারার এক তরুনী। " ও অশেষ ধন্যবাদ, ইয়ে মানে, মেনুটা আসলে ঠিক বুঝতে
পারছিলাম না "। " সে তো দেখতেই পারছি, তুমি কি শাকাহারী। " কোনরকম সূচনা না করেই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল সে।
" না, ঠিক তার উলটো, সর্বাহারী। " একবার বেয়ারার দিকে তাকালাম, বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে ওর চোখে-মুখে। " ঠিক আছে, তোমাকে তাহলে একটা ডিশ চেখে দেখতে বলি।" বলেই বেয়ারাকে কী যেন বলল,
আঙুল দিয়ে দেখালো দুই, বুঝলাম দুজনের জন্যই একই জিনিস ফরমাশ দিয়েছে। জানিনা কী খেতে চলেছি, আর আসল ব্যাপারটা ও তো জানিনা!!! " ও, তুমি ভাবছো বুঝি, খুব দামী জিনিসের
অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, মোটেও না। এটাই এখানের সবচেয়ে সস্তা খাবার,
মোটে ছয় ইউরো।" " হেঁ, হেঁ, দামটা নিয়ে কে ভাবছে? দামটা কোন সমস্যাই না।" ঝটপট উত্তর দিলাম।
জেসিকা আমার নামটা অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পারল দেখে ভাল লাগল। কতজনকে এই একটা শব্দ কতবার করে যে বলেছি তার ইয়ত্তা নেই।
জেসিকা মার্কিনী, মাদ্রিদে এসেছে ওর স্বামীর সাথে বেড়াতে। ভদ্রলোক
আবার গান-বাজনার মানুষ। মাদ্রিদেই কোথাও ক্ল্যাসিকাল গিটারের উপর ক্লাশ দিতে এসেছেন।
" আমার স্বামী যখন ক্লাশে, তখন ভাবলাম,
শহরটা একটু ঘুরে দেখি।" " উত্তম "। জেসিকা'র সপ্রতিভতার জন্যই খুব দ্রুত আমাদের আলাপ জমে উঠল। কথাপ্রসঙ্গে
ও জানাল, সে মিশ্র রক্তের মানুষ। তার বাবা আমেরিকান
আর মা দক্ষিণ কোরীয়। " আচ্ছা, তাই তো বলি,
তোমার চেহারায় চীনা ভাব আছে বেশ। ওফ,সরি। কিছু মনে কোরনা, আমাদের দেশে আমরা এমন
সব কথা বিনা দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে ফেলি যা কিনা তোমাদের কাছে বেজায় রূঢ় শোনায়।"
" হা হা, না না, আমি কিছু মনে করিনি। আসলে স্কুল থেকেই এ প্রশ্নটা আমি এতো শুনেছি যে এখন অভ্যস্ত
হয়ে গেছি।" ওকে আমি বললাম বাংলাদেশের কথা। আমাদের মানুষের কথা। আমাদের পারিবারিক
সংস্কৃতির কথা। জেসিকা জানাল সে কখনো এশিয়ায় আসেনি। তবে এশিয়া সম্পর্কে তার বেশ আগ্রহ।
কথার
পিঠে কথা জুড়ে দিতে দিতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। কামু, সার্ত্র,মার্কেজ থেকে গৌতম বুদ্ধ। জেসিকা জানাল তার
ভ্রমণপ্রীতির কথা। বললাম আমিও ঘুরতে ভালবাসি, তবে অনেকদিন ঘরের বাইরে থাকলে মন উতল হয়ে পড়ে। " আমরা বাঙালীদের ঘরকুনো হিসেবে
বেশ দুর্নাম আছে। আচ্ছা, তুমি বাবা-মা'কে মিস কর জেসিকা?" " নাহ, ঐ জিনিসটা আমার একদমই নেই।" " মানে?"
" মানে, আমি আসলে বাবা-মা'র অভাব্টাই বোধ করিনা। তোমার কাছে ব্যাপারটা বোধয় অদ্ভূত ঠেকছে,
না? শোন তবে। "
" আমার বাবা ছিলেন আমেরিকান মেরিন এর কমান্ডার। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন
এক কোরিয়ান নারীকে। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ, আমার বয়স তখন পাঁচ, ছোট বোনটির
দুই, মা আমাদের ফেলে রেখে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর
বাবা আবার বিয়ে করেন আর আমরা দুবোন বেড়ে উঠি বাবা'র নতুন পরিবারে। আমাদের চার দেওয়ালের ঘরে শুধু আমরা দুবোনের গায়ের রঙ বাদামী,
চোখ ছোট; আমাদের পরিপার্শ্ব
শুধু সাদা আর সাদা। বাড়িতে যখনই কোন পার্টি হত লোকজন আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাত,
স্কুলে সহপাঠিরা আমাদের ক্ষেপাত।"
" ওহ, জেসিকা আমি সত্যিই দুঃখিত। আচ্ছা, তোমার মা কখনও
তোমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন না? ফোনে কথা হত না?"
" না। মা কোথায় যে চলে গিয়েছিল তা আমরা জানতাম
না। আসলে ঐটুকু বয়সে জানা সম্ভব ও না। তবে আমার বয়স যখন তেইশ, তখন একদিন এক অদ্ভুত ফোন আসে আমার কাছে। এক মহিলা আমাকে বলেন
তিনি আমার জন্মদাত্রী মা। আমার সাথে দেখা করতে চান?"
" দেখা হয়েছিল?"
" হুম। উনি আমার ইউনিভার্সিটিতে আমার সাথে দেখা
করতে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে আমার মনে কোন অনুভূতিই জন্ম নেয়নি। দেখলাম চক্ষু কোটরাগত,
বিষন্ন চেহারার এক প্রৌঢ়া। আমার ছোট বোনের চেহারার সাথে অদ্ভুত
মিল। অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। খাপছাড়া। বললেন একসময় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। হতাশায় আত্মহত্যা
করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ও হয়েছেন। তুমি জানো তাঁর প্রতি আমার এমনকি কোন সহানুভূতি ও
হচ্ছিল না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের ফেলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিল। বলেছিলেন,
কোথাও চলে যাননি, বরং এতটা বছর
আমেরিকাতেই ছিলেন, এই শিকাগোতেই।"
" সরি জেসিকা। আমি তোমার মুডটাই খারাপ করে দিলাম।"
হাত নেড়ে ও বলল, " আরে নাহ। আমি ঐসব সেন্টিমেন্টালিস্টদের
দলে পড়িনা।"
খাওয়া শেষ হয়েই গিয়েছিল। গল্পটা শেষ হতেই
বিল চুকিয়ে উঠে গেলাম। ও বলল, " চল কাছের ঐ
পার্কটা ঘুরে আসি।" আমিও ওদিকটাতে যাব ভাবছিলাম। তাই বললাম, " বেশ তো, যাওয়া যাক।" পার্ক
দেল বুয়েন রেতিরোর ভেতর কতকিছু। রাজপ্রাসাদ, বিশাল দিঘী,ক্রিস্টাল প্যালেস, ঝর্ণা। দিঘীর বুকে দেখলাম ছোট ছোট নৌকায় লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমরা ঘাসের গালিচা মত একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনেই কতগুলো দেবশিশু ছুটোছুটি,
হুল্লোড় করছিল। হঠাৎ বোকার মত বলে বসলাম, " মানুষ হিসেবে তুমি ভাগ্যবান। মা হবার মত অসাধারণ একটা অনুভূতি
শুধু তুমিই পাবে, প্রকৃতি এই সৌভাগ্য আমাকে দেয়নি। আফশোস।"
আমার
কথা শুনে চমকে উঠল সে। বেশ জোর গলায় বলল," না। আমি মা হওয়ার মধ্যে অসাধারনত্বের কিছু দেখিনা। তুমি হয়ত শকড হবে আমার কথা শুনে।
আমি আসলে কোন সন্তানের মা হতে চাইনা।"
জেসিকা'র কথা প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে
রইলাম। তারপর বললাম, " তোমার স্বামী'র ও কি একই ইচ্ছা?" " তোমাকে তো বলাই হয়নি, মার্ক জার্মান। বিয়ের
আগে আমরা দুবছর একসাথে থেকেছি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে।
মার্ক ও চায়না আমাদের দুজনের ভেতর আর কেউ আসুক। যদি কখনো আমাদের সন্তানের অভাববোধ হয়
তবে আমরা দত্তক নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি। এই। আমার শরীরে আরেকটা প্রাণের জন্ম দেওয়ার
কথা আমি ভাবতেই পারিনা।"
" আচ্ছা জেসিকা, তোমার কি মনে হয় অবচেতন মনে তোমার মায়ের ব্যাপারটা
তোমার মধ্যে এমন শক্তভাবে গেঁথে আছে যে তোমার ভয় হয় তুমিও তোমার সন্তানকে ফেলে রেখে
চলে যাবে? আর এজন্যই তুমি মা হতে চাওনা?"
" জানি না। কে জানে? হবে হয়তো বা।" আনমনে উত্তর দিল ও।
এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল। কথা শেষ করে আমাকে
বলল, " মার্ক ফোন করেছিল। ওর ক্লাশ শেষ। আমি উঠছি
সুমাদ্রি। তোমার সাথে দেখো কত কথা বলে ফেললাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ সময়টুকু দেওয়ার
জন্য। আর হ্যাঁ, তোমাদের নদীর দেশ দেখতে একদিন অবশ্যই যাব।
তখন তোমার কথা মনে পড়বে আমার।" এই বলে সে উঠে পড়ল। আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম,
" ভাল থেকো। মার্ককে আমার শুভেচ্ছা জানিও।" জেসিকার চলে যাওয়ার
দিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সামনের ছোট্ট দেবশিশুগুলোর ছুটোছুটি আর হুল্লোড়ে
মুখরিত হয়ে উঠছিল বিকেলের পার্কটা।
