বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১

আমি কখনোই মা হতে চাই না।




  সেই সকাল থেকে হাঁটছি। রুম থেকে বেরুনোর আগে শুকনো দুটো রুটি চিবিয়ে এ কদিনে চুপসে যাওয়া পেটটাকে একটু আদর করে বলেছিলাম, " এই তোর সুযোগ, এ বেলা যদি না ঝরঝরে, নির্মেদ হতে পেরেছিস তো, আর কখনোই পারবি না।" কখনো কখনো এভাবেই উদ্ভট সব প্রবোধ দিতে হয় নিজেকে।

  কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ বোকা বানিয়ে রাখা যায় নিজেকে। গ্রান ভিয়া দিয়ে হেঁটে মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় পার্কটার কাছে এসে পড়েছি যখন, তখন কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বাঁ পাশের ফুটপাথের উপর জুড়ে বসল একটা ছোট্ট রেস্তোরাঁ। চোখ আর পেটের ভারী দোস্তি। আর যাই কোথায়! পেটের ভেতরে হঠাৎ যেন দাঙ্গা লেগে গেল। অতএব, রেস্তোরার বাইরে ফুটপাথের ওপরেই সাজানো চেয়ার-টেবিলে বসে পড়লাম। বেয়ারা গোছের একজন এসে প্রশ্নবোধক ভঙ্গী নিয়ে আমার দিকে ঝুঁকে পড়ল। স্পেন দেশে আমি আনপড়, স্প্যানিশ বুঝিনা। মেনুর উপর অনেকক্ষণ চোখ বুলিয়েও যখন কিছু ঠাউরে উঠতে পারছিলাম না, অমন সময় নারীকন্ঠের আওয়াজ, " তোমাকে সাহায্য করতে হবে মনে হচ্ছে? " হতচকিত হয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম বাদামী রঙা, চৈনিক চেহারার এক তরুনী। " ও অশেষ ধন্যবাদ, ইয়ে মানে, মেনুটা আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না "। " সে তো দেখতেই পারছি, তুমি কি শাকাহারী। " কোনরকম সূচনা না করেই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল সে। " না, ঠিক তার উলটো, সর্বাহারী। " একবার বেয়ারার দিকে তাকালাম, বিরক্তির রেশ ফুটে উঠেছে ওর চোখে-মুখে। " ঠিক আছে, তোমাকে তাহলে একটা ডিশ চেখে দেখতে বলি।" বলেই বেয়ারাকে কী যেন বলল, আঙুল দিয়ে দেখালো দুই, বুঝলাম দুজনের জন্যই একই জিনিস ফরমাশ দিয়েছে। জানিনা কী খেতে চলেছি, আর আসল ব্যাপারটা ও তো জানিনা!!! " ও, তুমি ভাবছো বুঝি, খুব দামী জিনিসের অর্ডার দিয়ে দিয়েছি, মোটেও না। এটাই এখানের সবচেয়ে সস্তা খাবার, মোটে ছয় ইউরো।" " হেঁ, হেঁ, দামটা নিয়ে কে ভাবছে? দামটা কোন সমস্যাই না।" ঝটপট উত্তর দিলাম।

  জেসিকা আমার নামটা অনায়াসেই উচ্চারণ করতে পারল দেখে ভাল লাগল। কতজনকে  এই একটা শব্দ কতবার করে যে বলেছি তার ইয়ত্তা নেই। জেসিকা মার্কিনী, মাদ্রিদে এসেছে ওর স্বামীর সাথে বেড়াতে। ভদ্রলোক আবার গান-বাজনার মানুষ। মাদ্রিদেই কোথাও ক্ল্যাসিকাল গিটারের উপর ক্লাশ দিতে এসেছেন। " আমার স্বামী যখন ক্লাশে, তখন ভাবলাম, শহরটা একটু ঘুরে দেখি।" " উত্তম "। জেসিকা'র সপ্রতিভতার জন্যই খুব দ্রুত আমাদের আলাপ জমে উঠল। কথাপ্রসঙ্গে ও জানাল, সে মিশ্র রক্তের মানুষ। তার বাবা আমেরিকান আর মা দক্ষিণ কোরীয়। " আচ্ছা, তাই তো বলি, তোমার চেহারায় চীনা ভাব আছে বেশ। ওফ,সরি। কিছু মনে কোরনা, আমাদের দেশে আমরা এমন সব কথা বিনা দ্বিধায় জিজ্ঞেস করে ফেলি যা কিনা তোমাদের কাছে বেজায় রূঢ় শোনায়।" " হা হা, না না, আমি কিছু মনে করিনি। আসলে স্কুল থেকেই এ প্রশ্নটা আমি এতো শুনেছি যে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।" ওকে আমি বললাম বাংলাদেশের কথা। আমাদের মানুষের কথা। আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতির কথা। জেসিকা জানাল সে কখনো এশিয়ায় আসেনি। তবে এশিয়া সম্পর্কে তার বেশ আগ্রহ।

 কথার পিঠে কথা জুড়ে দিতে দিতে আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেলাম। কামু, সার্ত্র,মার্কেজ থেকে গৌতম বুদ্ধ। জেসিকা জানাল তার ভ্রমণপ্রীতির কথা। বললাম আমিও ঘুরতে ভালবাসি, তবে অনেকদিন ঘরের বাইরে থাকলে মন উতল হয়ে পড়ে। " আমরা বাঙালীদের ঘরকুনো হিসেবে বেশ দুর্নাম আছে। আচ্ছা, তুমি বাবা-মা'কে মিস কর জেসিকা?" " নাহ, ঐ জিনিসটা আমার একদমই নেই।" " মানে?" " মানে, আমি আসলে বাবা-মা'র অভাব্টাই বোধ করিনা। তোমার কাছে ব্যাপারটা বোধয় অদ্ভূত ঠেকছে, না? শোন তবে। "

  " আমার বাবা ছিলেন আমেরিকান মেরিন এর কমান্ডার। ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন এক কোরিয়ান নারীকে। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু একদিন হঠাৎ, আমার বয়স তখন পাঁচ, ছোট বোনটির দুই, মা আমাদের ফেলে রেখে কোথায় যেন উধাও হয়ে যান। এর কয়েক বছর পর বাবা আবার বিয়ে করেন আর আমরা দুবোন বেড়ে উঠি বাবা'র নতুন পরিবারে। আমাদের চার দেওয়ালের ঘরে শুধু আমরা দুবোনের গায়ের রঙ বাদামী, চোখ ছোট; আমাদের পরিপার্শ্ব শুধু সাদা আর সাদা। বাড়িতে যখনই কোন পার্টি হত লোকজন আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাত, স্কুলে সহপাঠিরা আমাদের ক্ষেপাত।"

" ওহ, জেসিকা আমি সত্যিই দুঃখিত। আচ্ছা, তোমার মা কখনও তোমাদের সাথে দেখা করতে আসতেন না? ফোনে কথা হত না?"

" না। মা কোথায় যে চলে গিয়েছিল তা আমরা জানতাম না। আসলে ঐটুকু বয়সে জানা সম্ভব ও না। তবে আমার বয়স যখন তেইশ, তখন একদিন এক অদ্ভুত ফোন আসে আমার কাছে। এক মহিলা আমাকে বলেন তিনি আমার জন্মদাত্রী মা। আমার সাথে দেখা করতে চান?"

" দেখা হয়েছিল?"

" হুম। উনি আমার ইউনিভার্সিটিতে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে আমার মনে কোন অনুভূতিই জন্ম নেয়নি। দেখলাম চক্ষু কোটরাগত, বিষন্ন চেহারার এক প্রৌঢ়া। আমার ছোট বোনের চেহারার সাথে অদ্ভুত মিল। অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। খাপছাড়া। বললেন একসময় পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। হতাশায় আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ ও হয়েছেন। তুমি জানো তাঁর প্রতি আমার এমনকি কোন সহানুভূতি ও হচ্ছিল না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলাম আমাদের ফেলে রেখে কোথায় চলে গিয়েছিল। বলেছিলেন, কোথাও চলে যাননি, বরং এতটা বছর আমেরিকাতেই ছিলেন, এই শিকাগোতেই।"

" সরি জেসিকা। আমি তোমার মুডটাই খারাপ করে দিলাম।" হাত নেড়ে ও বলল, " আরে নাহ। আমি ঐসব সেন্টিমেন্টালিস্টদের দলে পড়িনা।"

খাওয়া শেষ হয়েই গিয়েছিল। গল্পটা শেষ হতেই বিল চুকিয়ে উঠে গেলাম। ও বলল, " চল কাছের ঐ পার্কটা ঘুরে আসি।" আমিও ওদিকটাতে যাব ভাবছিলাম। তাই বললাম, " বেশ তো, যাওয়া যাক।" পার্ক দেল বুয়েন রেতিরোর ভেতর কতকিছু। রাজপ্রাসাদ, বিশাল দিঘী,ক্রিস্টাল প্যালেস, ঝর্ণা। দিঘীর বুকে দেখলাম ছোট ছোট নৌকায় লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা ঘাসের গালিচা মত একটা জায়গায় গিয়ে বসলাম। সামনেই কতগুলো দেবশিশু ছুটোছুটি, হুল্লোড় করছিল। হঠাৎ বোকার মত বলে বসলাম, " মানুষ হিসেবে তুমি ভাগ্যবান। মা হবার মত অসাধারণ একটা অনুভূতি শুধু তুমিই পাবে, প্রকৃতি এই সৌভাগ্য আমাকে দেয়নি। আফশোস।"

 আমার কথা শুনে চমকে উঠল সে। বেশ জোর গলায় বলল," না। আমি মা হওয়ার মধ্যে অসাধারনত্বের কিছু দেখিনা। তুমি হয়ত শকড হবে আমার কথা শুনে। আমি আসলে কোন সন্তানের মা হতে চাইনা।"

 জেসিকা'র কথা প্রথমে যেন ঠিক বুঝতে পারলাম না। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, " তোমার স্বামী'র ও কি একই ইচ্ছা?" " তোমাকে তো বলাই হয়নি, মার্ক জার্মান। বিয়ের আগে আমরা দুবছর একসাথে থেকেছি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা দুজনের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। মার্ক ও চায়না আমাদের দুজনের ভেতর আর কেউ আসুক। যদি কখনো আমাদের সন্তানের অভাববোধ হয় তবে আমরা দত্তক নেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারি। এই। আমার শরীরে আরেকটা প্রাণের জন্ম দেওয়ার কথা আমি ভাবতেই পারিনা।"

 " আচ্ছা জেসিকা, তোমার কি মনে হয় অবচেতন মনে তোমার মায়ের ব্যাপারটা তোমার মধ্যে এমন শক্তভাবে গেঁথে আছে যে তোমার ভয় হয় তুমিও তোমার সন্তানকে ফেলে রেখে চলে যাবে? আর এজন্যই তুমি মা হতে চাওনা?"

" জানি না। কে জানে? হবে হয়তো বা।" আনমনে উত্তর দিল ও।

এমন সময় ওর ফোনটা বেজে উঠল। কথা শেষ করে আমাকে বলল, " মার্ক ফোন করেছিল। ওর ক্লাশ শেষ। আমি উঠছি সুমাদ্রি। তোমার সাথে দেখো কত কথা বলে ফেললাম। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ সময়টুকু দেওয়ার জন্য। আর হ্যাঁ, তোমাদের নদীর দেশ দেখতে একদিন অবশ্যই যাব। তখন তোমার কথা মনে পড়বে আমার।" এই বলে সে উঠে পড়ল। আমিও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, " ভাল থেকো। মার্ককে আমার শুভেচ্ছা জানিও।" জেসিকার চলে যাওয়ার দিকে আমি তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সামনের ছোট্ট দেবশিশুগুলোর ছুটোছুটি আর হুল্লোড়ে মুখরিত হয়ে উঠছিল বিকেলের পার্কটা।

সিলভা


সিলভার মুখে সেই তেজ আমি আর দেখতে পাইনা। ওকে দেখলে এখন ঝড়ে ভেঙ্গে পড়া কোন কুটিরের কথা মনে পড়ে।

অথচ এই সেদিনও এই চেহারাতে কী দীপ্তিটাই না ছিল। আমার সাথে দেখা হলেই সলাজ হাসি দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করত। আর আমি ওকে আরও লজ্জায় ফেলে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করতাম, তোমার বান্ধবীর কী খবর? বিয়ে করছ কবে? আমাদের ক্যাম্পের পাশেই ওদের গ্রাম কাসিয়াপ্লু। ক্যাম্পের ছোট্ট হাসপাতালটাতে মঙ্গলবার যখন আশে-পাশের গ্রাম থেকে রোগীরা এসে ভীড় করে, সিলভা  তখন দোভাষী হিসেবে কাজ করে আমাদের ডাক্তার স্যারের সাথে, বিনিময়ে আমরা তাকে দিই মুরগীর মোটা চামড়া যেটা দিয়ে তার মা রাতের খাবারের জন্য একটা সস তৈরী করে। ছাব্বিশ বছরের সমর্থ যুবক হিসেবে পরিবারকে এর চেয়ে বেশী কিছু সাহায্য করতে না পারায় বেচারা সবসময়ই কুন্ঠিত হয়ে থাকে।

ছোটখাটো গাট্টা-গোট্টা গড়নের ছেলেটার বুদ্ধির আভাস পাওয়া যায় ওর কথা-বার্তায়। মাঝে মাঝে ওকে নিয়ে দূরের কোন গ্রামের পথে গেলে আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কথাও। ওর সাথে দেখা না হলে অন্য সবার মত আমিও হয়তো ভাবতাম এই জংগলাকীর্ণ প্রত্যন্ত আফ্রিকান গ্রামে আর যাই থাকুক সভ্য মানুষের দেখা হয়ত মিলবেনা। সিলভা আমার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমার মানসও আসলে বর্ণবাদী সংস্কৃতির ছায়ায় ঢাকা। একদিন ওর গ্রামে কী একটা কাজে গেলে ওর বাড়িতে একটা ঢুঁ মারি। সাধারণ আফ্রিকান বাড়িগুলো দেখেছি একটু অপরিচ্ছন্ন হয়। কিন্তু সিলভাদের ছোট্ট বাড়িটার সবখানে রুচির ছাপ। আমাকে ও দেখাল তার ছোট্ট ঘরটা, ওর বইয়ের তাক, ছবি আঁকার খাতা। মানিব্যাগ থেকে বের করে দেখাল ওর বান্ধবীর ছবি। একটা ঝর্ণার পাড়ে তোলা ছবি। ওকে আবারও একটু লজ্জ্বা পাইয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলাম, বাহ, বেশ মিষ্টি দেখতে তোমার প্রেমিকা। তো, বিয়েটা করছ কবে তোমরা? মুখে সেই লাজুক হাসিটা টেনে সিলভা বলেছিল, খুব শীঘ্রই। সামনেই আমাদের দেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা। আমি জোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। ওর আত্মবিশ্বাস দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। তাই বলেছিলাম, ধর যদি তুমি চাকরীটা না পাও, আহা ধরই না, চাকরীতো আর আভোকাদো ফলনা, তাও আবার প্রথম শ্রেণীর সরকারী চাকরী, তখন তোমার প্রেমিকার হাত বদল হয়ে যাবেনাতো আবার? কথাটার কী বুঝল সে কে জানে, আমাকে সরাসরি বলেছিল, দেখ আমি বুদ্ধিমান ছেলে, চাকরী আমার না হয়ে যাবে কোথায়? ভেবনা, তুমি আফ্রিকান বিয়ে দেখে যেতে পারবে।

আইভরী কোস্টের রাজধানী আবিদজানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেছে সিলভা। আবিদজানের গল্প ওর কাছ থেকেই শোনা। কাসিয়াপ্লু গ্রামে জন্ম হলেও ও বেড়ে উঠেছে এই শহরে। ও বলত, আবিদজান গেলে তোমার খুব ভাল লাগবে। জানোতো এ শহরকে আফ্রিকার প্যারিস বলা হয়। চারদিকে শুধু লেগুন। বড়, বড় সব দালান। দক্ষিণ থেকে ভেসে আসে আটলান্টিকের নোনা হাওয়া। তোমাকে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে নিয়ে যাব সুযোগ পেলে। আবিদজান আমি গিয়েছিলাম ঠিকই কয়েক মাস পর, তবে জৌলুসের বদলে এ শহর আমাকে তখন উপহার দিয়েছিল ধ্বংসস্তুপ আর পোড়া মানুষের গন্ধের বিভৎস এক ছবি। এর লেগুনগুলোতে ভেসে যেতে দেখেছি পেটফোলা মরা মানুষের পচা লাশ।

প্রায়শই ও আমাকে বলত, জানো, ফ্রান্স আমাদের দেশটাকে কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবেনা। তোমরা জানো ফ্রান্স হল শিল্প-সাহিত্যের তীর্থভূমি। ফরাসী দার্শনিকদের বুলি তোমাদের অনুপ্রাণিত করে। অথচ আমাদের দেশটাকে এখনও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে রেখে, আমাদের টাকায় ওরা শিল্পোন্নত, সুপার-পাওয়ার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের সমস্ত সমস্যার মূলে কোথাও না কোথাও ফ্রান্সের দুষ্ট হাত লুকোনো থাকে। আমি একটু আহা-উহুঁ করলে ও সুন্দরভাবে আমায় বুঝিয়ে দিত আফ্রিকাকে কীকরে নানা কৌশলে এখনও শোষন করে যাচ্ছে ফ্রান্স। তারপর মুখে একটা দৃঢ় প্রত্যয়ের ভাব এনে সে বলত, তবে দেখ, একদিন আমরা মাথা তুলে দাঁড়াব।

তারপর আইভরী কোস্টে শুরু হল নির্বাচনোত্তর সহিংসতা। বিদ্রোহী বাহিনীর হাতে একের পর এক শহরের পতন ঘটতে থাকল। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে লেগে গেল নৃশংসতম গৃহযুদ্ধ। দুয়েকুয়ে নামক ছোট্ট শহরে এক রাতেই অনেকগুলো গ্রাম পুড়েছে। গুরো জাতিগোষ্ঠীর হাতে গোনা কজন লোকই সে রাতে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে পেরেছিল গভীর অরন্যে। আমরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে দেখেছি সে বর্বরতার চিত্র। আর আবিদজানে বিদ্রোহীরা পৌঁছানোর পর শুরু হল ভয়াবহ যুদ্ধ। আল-জাজিরায় সে যুদ্ধের নিয়মিত ঘটনা পরিক্রমা দেখে আমরা শিউরে উঠতাম। আফ্রিকার প্যারিস আবিদজান তখন যেন একটা মৃত্যুপুরী। এখানে ওখানে পড়ে থাকত লাশ। আর সমস্ত দোকান-পাট ঘর বাড়িতে চলেছে লুঠতরাজ আর ধ্বংসযজ্ঞ। সে কদিন বিভিন্ন কাজে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে সিলভার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। তারপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পর আমি ছুটিতে চলে এলাম ফ্রান্সে। আহা ফ্রান্স- ছবির দেশ, কবিতার দেশ! সিলভার কথা তখন আমি বেমালুম ভুলে গেছি।

মাসাধিককাল ইউরোপে কাটিয়ে যখন আইভরী কোস্টে ফিরে এলাম তখন আফ্রিকা আর আমার মনে ধরেনা। কাজে মন বসেনা। মন পড়ে থাকে ভেনিসের গোলক ধাঁধাময় রাস্তায়। মাদ্রিদের পুরোনো চত্বরগুলোতে। অস্ট্রিয়ার রাজপ্রাসাদের এখানে ওখানে। প্যারিসের বড় বড় মিউজিয়ামগুলোতে। কদিন এভাবে যাওয়ার পর গা ঝাড়া দিয়ে আবার শুরু করলাম কাজ। এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে যাওয়া। কী একটা কারণে হঠাৎ কাসিয়াপ্লু যাওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সেদিন সিলভার কথা মনে পড়ল। খবর দিয়ে ওকে আনালাম। ওর সেই হাসিখুশী চেহারাটা দেখতে পেলাম না। ওর দীপ্তিময় চোখদুটোতে দেখলাম বিষাদ। পরিবেশটা একটু হাল্কা করার জন্য আমি আমার পুরোনো কৌশলটাই আবার প্রয়োগ করলাম। বললাম, কী খবর সিলভা? তোমার বান্ধবীর কেমন আছে? বিয়েটা হচ্ছে তো? সিলভার চেহারায় কোন পরিবর্তন এলোনা, বরং মাথাটা নীচু করে থেকে কিছুক্ষণ পর আমায় বলল, আমায় কী যেন কাজে ডেকেছিলেন? সিলভার বিষন্ন চোখ দুটোতে জলের আভাস বেশ টের পেলাম। ওর কাজটা ওকে বুঝিয়ে দিতেই ও আসি বলে চলে গেল। আমি ঠিক বুঝতে পারলামনা আমার কোন কথাটা ওকে এমন কষ্ট দিতে পারে।

দুদিন পর সিলভার বন্ধু হেনরী আমার কাছে এলে ওকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা তোমার বন্ধু হঠাৎ কী হল? অমন চুপ মেরে গেছে কেন? ওর পরীক্ষাটার কী হল? হেনরী একটু চুপ থেকে বলল, আপনি কিছু শোনেননি? বললাম, না, কেন কী হয়েছে?

-          ফাতু, মানে সিলভার বান্ধবী গুরো সম্প্রদায়ের। দুয়েকুয়েতে ওদের গ্রামটাতে যেদিন রেবেলরা হামলা চালায়, ফাতু সেদিন গ্রামেই ছিল। ওর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা সেদিনের পর থেকে। আপনি বুঝতেই পারছেন ওর ভাগ্যে কী ঘটেছে। ও গ্রামের দুয়েকজন ছাড়া বাকি সবাইকে কচুকাটা করেছে ওরা। তারপর থেকেই সিলভা চুপ হয়ে গেছে। আর এ গন্ডগোলে সব পরীক্ষাই বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

আমি কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল সিলভার লাজুক হাসিটার কথা। আর একটা কাল মিষ্টি মেয়ের ছবি যার পেছনে নেচে বেড়াচ্ছিল ছোট্ট একটা পাহাড়ী ঝর্ণা।

আফ্রিকায় যখন বৃষ্টি নামে


                                                                  
  গতরাতে বৃষ্টি হল পাগলের প্রলাপের মত অবিশ্রান্ত।আফ্রিকার আকাশ বাংলার আকাশের মত সুনীল হলে কি হবে,এর অভিধানে অভিমান শব্দটি নেই।তাই এখানের বৃষ্টি দেখে একবার ও মনে হয়না আকাশের আজ মন খারাপ। মনে আছে যখন আসি এখানে তখন এক কাল বন্ধুকে বেশ গর্বভরে বলেছিলাম আমি বর্ষার দেশের মানুষ। বৃষ্টির জল আমাদের হৃদয়ের ভাষা বোঝে।কি জানি কি ভেবে বন্ধুটি আমার হেসে বলেছিল আফ্রিকার বর্ষা অতোটা রোমান্টিক নয়।এখানের প্রকৃতির সাথে আমাদের শ্যামলিমার অনেক মিল থাকলেও বৃষ্টি-প্রেমের অতীব গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ কদম ফুলের গাছ কোথাও চোখে পড়লনা এ কমাসে।আহা কদম ফুল!পৃথিবীতে অমন সুন্দর ফুল কটি ফোটে বর্ষাকালে।মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে চারপাশের পাহাড় থেকে যখন ভেসে আসত বুনো কদমের মায়াবী গন্ধ তখন জন কীটস পড়াতে আসা শিক্ষকটি ও হঠাৎ যক্ষের মত বিরহী হয়ে উঠতেন।পৃথিবীর অন্য ভাষায় বর্ষাবন্দনা অমন করে কি হয়েছে কোনকালে?

  রাতে বৃষ্টি হলে তারপরদিন সকালে ক্যাম্পের সামনের পাহাড়ে নেমে আসে মেঘের দল।সে এক অপূর্ব,অপার্থিব দৃশ্য।যেন মনে হয় পাহাড়গুলোকে সান্ত্বনা দিতে আসে ওরা,কিংবা অন্য আকাশের অন্য পৃথিবীর গল্প,ঘ্রাণ নিয়ে আসে ওদের কাছে।এই যে পাহাড়গুলো কার অভিশাপে কত হাজার বছর ধরে মাটির সাথে আটকে পড়ে আছে কে জানে,তাদের জন্য ভারী মায়া হয় মাঝে মাঝে।প্রখর রোদে তারা জ্বলে পুড়ে যায়,দূর্দান্ত হাওয়া তাদের শরীর ছিঁড়ে দেয় আর বৃষ্টির প্রচন্ডতার মাঝে তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকে বিদ্যুতের নকশা দেখে আকাশে।লাবণ্য শব্দটা ঠিক মানায়না এ বর্ষার জন্য।যখন আসি এ দেশে তখন মাঝে মাঝে আকাশে আসতেন 'হারমাটান'।লাল ধূলায় আকাশ ঢেকে ফেলে দানবের মত হুংকার ছাড়তে ছাড়তে তিনি ছুটে যেতেন গ্রাম,শহর আর সাভানার ওপর।আচেবির গল্পে পড়েছি পঙ্গপালের ঝাঁকের আকাশ ঢেকে ফেলার কথা।হারমাটানের কবলে পড়লে আমাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝরত,তাই পরবর্তীতে যখনই আকাশে লাল ধূলোর মেঘ দেখতাম আমি ভোঁ দৌঁড় দিয়ে ফিরে আসতাম আমার রুমে,তারপর ঝড় থেমে গেলে খোঁজ নিতাম কার নাক দিয়ে কতটুকু রক্ত ঝরল।

বাংলার বৃষ্টির সাথে অদৃশ্য নুপুরপরা অপ্সরারা নাচে।কান পাতলেই শোনা যায় ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম।গ্রামে টিনের চালে একটা মধুর শব্দ হত,ঝোপ থেকে,ডোবা থেকে অবিরত ব্যাঙেরা প্রণয়গীত গেয়ে যেত।আমরা তখন মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক দৌঁড়ে উঠোন পেরিয়ে চলে যেতাম আম বাগানে,তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে আসতাম ঘরে দুপকেট ভরে কাঁচা আম নিয়ে।কখনো কখনো শিলাবৃষ্টি হলে মা বলতেন, আকাশের ওপারে যে দুষ্টু ছেলেদের দল আছে তারা আমাদের হিংসে করে বরফের ঢিল ছুঁড়ে মারছে।তখন ভেবে কূল পেতামনা ওই সব দুষ্টু ছেলেদের সাথে আমাদের কিসের শত্রুতা।মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শুনতাম,

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

এরকম বর্ষামেদুর দিনে কখনো স্কুলে যেতে না হলে,ঘরে বাবা থাকলে আমি দোতলার একলা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি আকাশ দেখতাম আর ওপারের দুষ্টু ছেলেদের খুঁজে বেড়াতাম। তখন চোখে পড়ত রজনী জেঠা মাথায় জোঁইর চাপিয়ে বিলের কিনারে ঘাস কাটছেন, ওপাড়ার নীলু ইয়া বড় কচুপাতাকে ছাতা বানিয়ে মাথার ওপর ধরে ঘরে ফিরছে,আর চারদিকে সেই অমোঘ সংগীত।ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম। এ সুর বহুদূরের ওপার থেকে ভেসে আসা সুর।

এখানের বৃষ্টি যেন হুংকার ছাড়ে,আমার প্রিফ্যাবের ছাদে দুমদাম কিল বসায়।ভেকেদের গীতে প্রণয়ের লেশমাত্র ও নেই।আমি খুব আশা করে বসে থাকি কোথাও বাজবে মেঘ রাগ কিংবা রবীন্দ্রনাথের গান।বৃষ্টিতে ভেসে আসে বৃশ্চিক আর সাপ।আতঙ্কে আমরা রুমে নিজেদের বন্দী করে রাখি।আমাদের পোষা হরিণ দুটো মায়াময় চোখে ভিজে যেতে থাকে।জলের তোড় মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে যেতে একটা ধারা তৈরী করলে আমার কাগজ দিয়ে নৌকা বানাতে খুব ইচ্ছে করে।ছোটবেলায় এভাবে আমি পাড়ি দিতাম সাগর-মহাসাগর।জানিনা কোন অদ্ভুত কারনে বৃষ্টি এলেই শৈশবটা স্মৃতি থেকে লাফিয়ে পড়তে চায় যৌবনের আঙিনায়।

গতকাল সারাটা রাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হল।এটা বর্ষাকাল শুরুর পূর্বাভাষ।এ ঋতুতে এখানে আকাশ ভেঙে ভেঙে পড়ে।কখনো কখনো টানা এক সপ্তাহ।সকালে দেখলাম মেঘগুলো নেমে এসেছে পাহাড়ের কোলে।হয়তো নতুন কোন পৃথিবীর নতুন কোন গল্প নিয়ে।আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করে মেঘ রাগ কিংবা মায়ের কন্ঠ-

   নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
   ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১১

আফ্রিকার প্যারিস- আবিদজান
























   প্যারিস-কে বলা হয় শিল্পের নগরী,সৌন্দর্যের দেবী যেন এ শহরে অধিষ্ঠাত্রী হয়ে আছেন।২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বোমারু বিমানগুলো ইউরোপের বড় বড় শহরকে ভূলন্ঠিত করলে ও প্যারিসের উপর কী এক অদ্ভুত কারণে তারা বারুদের ছোঁয়া ও লাগায়নি।২০০৮ সালের শরতে প্যারিস-কে দেখে বুঝেছিলাম কোন দৈববলে দেবী নাজীদের পাষান হৃদয়ে ও সুরের ঝংকার তুলেছিলেন।আফ্রিকা মহাদেশের এককোনায় ও শুনেছিলাম ছোট্ট একটা প্যারিস আছে কিন্তু তার নাম ভিন্ন।আবিদজান।খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম,আবিদজান আইভরী কোস্ট নামক একটা সাবেক ফরাসী উপনিবেশের রাজধানী।ফরাসীদের যখন উপনিবেশ তখন হয়ত ব্যাপার একটা আছে,মনে মনে ভেবেছিলাম।তখন কল্পনাও করিনি বছর তিনেক পর সেই উপনিবেশেই রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে জাতিসঙ্ঘের একটা চাকরী নিয়ে আমি কাজ করতে আসব দীর্ঘদিনের জন্য।আইভরী কোস্ট-এর প্রত্যন্ত একটা মফঃস্বল শহরে যখন ধুলিমাখা হয়ে আসি,তখন সেখানে রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে।প্রায় দশ বছর ধরেই দেশটা ভাগ হয়ে আছে দুভাগে,সরকার সমর্থিত দক্ষিণভাগ আর বিদ্রোহীদের দখলে থাকা উত্তরভাগ।আমি এসে দেখলাম আফ্রিকার প্যারিস আমার সেই মফঃস্বল শহর থেকে ৮০০ মাইল দূরে,আর বরাতে আমার পড়েছে বিদ্রোহীদের কব্জায় পড়ে ধুঁকতে থাকা দক্ষিনের শহর মঁ।যদিও মঁ শান্ত,পাহাড়ী,মেঘের আঁচলে লুকিয়ে থাকা সুন্দর একটা জায়গা; আমার মনপাখি বারবার উড়ে চলে যেতে চাইত আফ্রিকার প্যারিসের আকাশে।কে জানে কেমন ঐ শহরটা,তার মাঝখানে ও কি আইফেল টাওয়ারের মত কিছু আছে কিনা,কিংবা তার নদীর উপর যে সেতুগুলো আছে সেখানে শিল্পীর দল তুলি আর ক্যানভাস নিয়ে সারাদিন ছবি আঁকায় মগ্ন থাকে কিনা,এসব ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমি অস্থির হয়ে পড়তাম।এভাবেই কেটে গেল চারটি উষ্ণ মাস।এই চার মাসে আবিদজানে মরেছে বিস্তর মানুষ,আন্তর্জাতিক মহলের খবরদারী আর চোখ রাঙ্গানিকে উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে আবিদজানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন  উপনিবেশ-বিরোধী,স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট লরেন্ট বাগবো।এইখানে কিছুটা পরিপ্রেক্ষিত দিয়ে রাখা ভাল।দীর্ঘকাল ফ্রান্সের উপনিবেশ থাকার পর ১৯৬০ সালে আইভরী কোস্ট স্বাধীনতা লাভ করে কিন্তু আজ পর্যন্ত নেপথ্যে থেকে এই দেশের উপর খবরদারি চালিয়ে যাচ্ছে শিল্প-সাহিত্যের আবছায়ায় নিজেকে আড়াল করে রাখা সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্স।এই দেশের সমস্ত খনিজ সম্পদ তুলে নিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানীগুলো কোন রকম রাজস্ব না দিয়েই।এই দেশের চিরহরিৎ বনগুলোকে উজাড় করে দিচ্ছে লেবানীজ আর ফরাসী বনদস্যুরা।প্রধান কৃষিজ দ্রব্য কোকো আর কফি এদেশ থেকে নামমাত্র মুল্যে কিনে নিয়ে বাজারজাত করছে ফ্রান্স-এ আর ফ্রান্স থেকেই চালান যাচ্ছে সারা বিশ্বে।এদেশের বিদ্যুত,পানি এবং টেলিযোগাযোগ ব্যাবস্থার মালিক হল ফ্রান্সের বিভিন্ন ক্ষমতাধর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান। অবাক হলে ও সত্যি এদেশের ভেতরই বিশাল এক এলাকা জুড়ে রয়েছে ফ্রান্সের ক্যান্টনমেন্ট। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই উপনিবেশ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লরেন্ট বাগবো নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসেন ২০০০ সালে,আর ঠিক তার দুই বছর পরই ক্যুর মাধ্যমে দেশটির উত্তর অংশ দখল করে নেয় সেনাবাহিনীর একটা অংশ।নিজেদের এরা রেবেল পরিচয় দিতেই ভালবাসে। প্রধানত মালি,বুরকিনা ফাসো,গিনি,ঘানা এসব দেশের অভিবাসীরাই বিদ্রোহীদের দল ভারী করে তোলে। এবং স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্স এই সুযোগটা লুফে নেয়,বাগবো সরকার সবসময় অভিযোগ করে এসেছে যে ফ্রান্স গোপনে বিদ্রোহীদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে,অস্ত্র এবং অর্থের যোগান দিয়ে। দুবছর যেতে না যেতেই ২০০৪ সালে বাগবো সমর্থক এবং ফরাসী সৈন্যদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ লেগে যায়,ফরাসী যুদ্ধ বিমান বোমা মেরে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় আইভরী কোস্ট-এর বিমান বাহিনীকে,আবিদজানে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। কয়েকমাস পর সরকার এবং রেবেলদের মধ্যে একটা শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয় জাতিসংঘের পৌরহিত্যে যার ভিত্তিতে দেশটি দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে সরকার নিয়ন্ত্রিত দক্ষিনভাগ আর বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত উত্তরভাগে।সেই থেকে ২০১০ সাল অবধি সবুজ এই দেশটি শান্তই ছিল,অশান্তি মাথা-চাড়া দিয়ে উঠে অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে হওয়া এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট বাগবো এবং অভিযোগ তোলেন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির।উল্টো নিজেকেই তিনি বিজয়ী ঘোষনা করে বসে শপথ নিয়ে বসেন।একই সাথে আনর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসঙ্ঘের রায়ে নির্বাচিত প্রার্থী আলাসান ওয়াতারা ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে ফেলেন।আফ্রিকা-র প্যারিস আবিদজানে শুরু হয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাশা খেলা এবং এরই মাঝে পড়ে খুন হয়ে যায় শত শত মানুষ।আবিদজানে যখন ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে দুই প্রেসিডেন্ট এর সমর্থক এবং যোদ্ধাদের মধ্যে,তখন ৭০০ মাইল দূর থেকে বসে প্রতিদিন আমি উৎকন্ঠা নিয়ে ভাবতাম আমার আফ্রিকার প্যারিস দেখা বোধ হয় আর হবেনা।প্রতিদিন খবর পেতাম আবিদজানের রাস্তায় মানুষ পোড়ানো আর শপিং মল গুলোতে লুটপাটের খবর।আর আমি বিমর্ষ হতাম ভেতরে ভেতরে।আবিদজান এ যখন বিদ্রোহী বাহিনী ঢুকে পড়ে,আর জাতিসঙ্ঘ আর ফরাসী সৈন্যরা যৌথভাবে বিমান হামলা চালায়,বিশাল এ শহর তখন যেন একটা মৃত্যুপুরী।এখানে ওখানে লাশের পাহাড়,আর মানুষ পোড়ার গন্ধ,আর রক্তের দাগ,আর ভয়।ভয়।উত্তরে থেকে তখন আমরা দেখছি অমানবিক জাতিগত সহিংসতা,আবিদজান থেকে উৎখাত হওয়া মানুষের ঢল,আর মানুষের চোখে অবিশ্বাস আর ঘৃনা।দুয়েকুয়ে নামক একটা শহরে একদিনেই খুন হয়েছে হাজারো মানুষ।লাশের গন্ধ যে কী বিবমিষাকর তা এই প্রথমই আমার টের পাওয়া।শেষ পর্যন্ত সিংহপুরুষ বাগবোকে যখন গ্রেফতার করা হল তার প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ থেকে,তখন উত্তরে খুশীর জোয়ার।রাস্তায় রাস্তায়  বর্ণিল পোষাকে সজ্জিত নারীদের মিছিল। আবিদজানে ঢোকার পথে এখন আর কোন বাধা নেই।

বাগবো'র পতনে আমি যে খুশি হয়েছি এমন নয়,বরঞ্চ তার প্রতি সবসময় একটা সহানুভূতিই টের পেয়েছি ভেতরে ভেতরে।কিন্তু আমি আদার ব্যাপারী।আমার খুশি-অখুশিতে পৃথিবীর অন্যায় থেমে যাবেনা।আমি বরং আবিদজান দেখতে পাবো এজন্যই পুলকিত।এর মাস খানেক পরই এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।বিমান থেকে আবিদজানের যে ছবি আমি দেখতে পেলাম তাতেই আমি মোহিত।এটা একটা লেগুনে ঘেরা বিশাল শহর।আবিদজানে পা রেখেই আমি অবাক হলাম নগরবাসীর কর্মচাঞ্চল্য দেখে।কে বলবে এ শহরেই মাত্র কদিন আগে হাজারো মানুষ গুলি খেয়ে মরেছে।আবিদজানে সড়কে গাড়ির ঢল দেখে ও অবাক হলাম।আসলে দীর্ঘ দশ বছর ধরে এ দেশটা একটা সংকটে আছে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চাইবে এটার অবসান হোক।মানুষগুলোর চেহারায় ও তাই ক্লান্তির ছাপ।আবিদজান ফরাসীদের হাতে গড়া শহর।এর লেগুনগুলোর উপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটো সেতু অনেকটা সীন নদীর ওপরের সেতুগুলোর মতই।যুদ্ধের সময় এই লেগুনগুলোতে নাকি ভেসে যেত মানুষের লাশ।সারাটা শহরে দেখলাম ফ্লাই ওভারের ছড়াছড়ি,এ শহরে একবার রাস্তা হারালে নতুন ড্রাইভারের যে কি হাল হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।আবিদজানের সুউচ্চ দালানগুলো সব ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান।মূলত ফরাসীরাই এসব ব্যাবসার মহারথী,মিডলম্যান হিসেবে আছে লেবানীজরা।আইভরীয়ানরা এসব অফিসে চাকরী করে।শহরের অফিস পাড়ার নাম প্লাতো,এখানেই রয়েছে ফ্রান্সের দূতাবাস,স্টেডিয়াম,ব্যাংক আর শপিং মলগুলো।সন্ধ্যায় আমরা কদিন পিজ্জা খেতে গেছি রেস্টুরেন্ট পাড়া জোন ফোর-এ।আবিদজানের একটা ব্যাপার দেখে খুব ভাল লাগল,তা হল এরা মোটামুটি আইন মেনে চলা পাবলিক।গাড়ীগুলো চলছে সারিবদ্ধভাবে।লালবাতি পড়লে থেমে যাচ্ছে।এখানে ওখানে ময়লার স্তুপ ও নেই।এ শহরের বনেদী পাড়া হল কোকোদী।এখানেই প্রেসিডেন্ট বাগবোর বাসা।এখানেই আবিদজানের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়।এখানেই সব অভিজাত লোকেদের বাস।কোকোদীতে আমরা প্রায়শঃ বেড়াতে যেতাম আবিদজানের সত্যিকারের চেহারা খুঁজে পেতে।শহরের উপকন্ঠে রয়েছে আবিদজানের সৈকতগুলো।আটলান্টিকের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রান্ড বাসাম,বা আশ্বিনি সৈকতে এখন পর্যটকের কোন কোলাহল নেই।এখানে সৈকতগুলো মারাত্মক রকমের ঢালু,আর স্রোতের সে কি টান,আমাদের কক্সবাজার সে তুলনায় ঢের মনোরম।তবে গ্রান্ড বাসাম সৈকতের মূল আকর্ষন তার শিল্প বাজার।আইভরীয়ানদের কাঠের কাজ অতুলনীয়।মূলতঃ সেনুফু সম্প্রদায়ের লোকেরাই এই পেশার সাথে জড়িত।বাজার জুড়ে সারি সারি দোকানগুলো আমার কাছে এক অন্য পৃথিবীর রুপ তুলে ধরছিল যেন।প্রতিটি দোকানই আমার কাছে মনে হচ্ছিল এক একটা মিউজিয়াম যেখানে মূর্ত হয়েছে আফ্রিকানদের সৌন্দর্যবোধ,তাদের বীরত্মগাঁথা,তাদের দৈনন্দিন জীবনের সহজিয়া কথকথা।আবিদজানের আকাশচুম্বী দালান আর রাস্তাঘাট আমাকে একটা পরিকল্পিত শহরের ধারনা দিলেও সাগর পাড়ের শিল্পের এই দোকানগুলো-ই আমাকে এ শহরের খ্যাতির রহস্য বলে দেয়।প্যারিসে ও সীন নদীর ওপর শিল্পীরা বসে এঁকে চলে ঠিক যেভাবে সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে সেনুফু তরুন ছেনি দিয়ে ইরোকো কাঠের ওপর ফুটিয়ে তোলে আফ্রিকার ছন্দগাঁথা।এখানেই আবিদজান আর প্যারিসের মধ্যে আমি দেখতে পাই এক অভূতপূর্ব মিল।

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১

মায়াময় গ্রোনব্ল।












 শঁবেরী( chambery)  স্টেশনে নেমেই শুনলাম ঝামেলা। গ্রোনব্ল( Grenoble) যাবার ট্রেনরুটে নাকি কাজ চলছে। তো কী হবে এখন? " ঘাবড়ানোর কিছু নেই মঁসিয়ু, আপনাদের জন্য আমাদের বিশেষ বাস-সার্ভিস আছে, আসুন আমার সাথে।" কাউন্টারের সামনে দাঁড়ানো সদাশয় অফিসারটি অভয় দিয়ে বললেন। যাক, আমিতো ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলাম। বাসে উঠতে না উঠতেই ড্রাইভার এস্কেলেটরে পা দিল, হুমড়ি খেয়ে পড়লাম সুইস তরুনীটির ওপর (আলাপচারিতায় পরে জেনেছিলাম), মুমুকে বিদায়ও জানাতে পারলাম না ভাল করে, যেন আমার অপেক্ষাতেই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল দোতলা গাড়িটা।

   যাত্রাপথ দুঘন্টার। ইতালী সীমান্তবর্তী ফরাসী শহর গ্রোনব্ল। আল্পস পর্বত দিয়ে ঘেরা মনোরম উপত্যকার উপর গড়ে উঠেছে এ শহর। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ডরোথী আর ফ্রঁসোয়া থাকে এখানে। গেল বছর দেশেই ফ্রঁসোয়ার সাথে দেখা হলেও ডরোথীর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল ঠিক পাঁচ বছর আগে। গ্রোনব্ল-এ যাওয়ার মুখ্য উদ্দেশ্য তাই বন্ধু দর্শন, তবে ফাঁকতালে শহরটাও ঘুরে ফেলা যাবে এটাও ছিল মনে।

 গ্রোনব্ল-কে বলা হয় আল্পসের রাজধানী। মূলতঃ তিনটি বিশাল পর্বতশ্রেণী শার্তোজ, ভের্কোস আর বেলদোন এর মাঝখানে চুপটি মেরে বসে আছে এ শহর যেখানে এসে মিলেছে দ্রাক আর ইজের নদী। ফ্রান্সের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে এ শহরের রয়েছে বেশ খ্যাতি। আর ফরাসী বিপ্লবের মশালটাতো জ্বলেছিল সর্বপ্রথম এ শহরেই। এরকম অনেকগুলো কারনেই এ শহরটা বেশ পরিচিত পর্যটক মহলে। বিশেষকরে স্কি খেলোয়াড়দের স্বর্গরাজ্য এই গ্রোনব্ল, শীতে যখন পাহাড়গুলো বরফের পুরু আস্তরনে ঢেকে যায়, তখন তাদের চূড়া থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে দুঃসাহসী স্কি-বাজেরা।

শঁবেরী থেকে গ্রোনব্ল আসার পথটা ভীষণ সুন্দর। ইউরোপীয়ান বিশাল হাইওয়ে, সোজা চলে গেছে ইতালী। রাস্তার দুপাশ জুড়ে কখনও যবের ক্ষেত, কখনও সূর্যমুখীর বাগান, কখনও বা ছোট ছোট বন।  পুরো ফ্রান্স জুড়েই দেখলাম খালি ক্ষেত আর সবুজ বনাঞ্চল। প্রতি ছয় বছর অন্তর এক একটা জায়গার এরকম ছোট বনাঞ্চলগুলো সরকার কেটে ফেলে গাছগুলোকে বিভিন্ন কাজে ব্যাবহার করার জন্য। বনায়ন শুরু হয়ে যায় সাথে সাথেই, পরবর্তী ছয় বছরের ভেতর যখন আবার এখানে ছোট একটা বন তৈরী হচ্ছে, সরকার তখন অন্য জায়গা পরিস্কার করার কাজে ব্যস্ত।  গ্রীষ্মের মধুর বিকেল পড়ে আছে ইউরোপের মাঠে মাঠে।ক্ষেতে ক্ষেতে দেখলাম চাকার মত গোলাকার সব খড়ের গাদা।আমার ফরাসী ভাষার শিক্ষক গুরুপদ চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে যায় তখন। ইউরোপের গ্রামের দিকটা কেমন জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু বলতেন, “ জাস্ট লাইক পিকচার।” বাসের জানালাটাকে আমার কাঁচের ফ্রেম মনে হয়। মনে হয় যেন কোন চলন্ত ছবি দেখছি।
দুঘন্টা যে কোনদিকে ফুরুৎ করে উড়ে গেল টের পেলাম না। হঠাৎ দেখলাম বাস ঢুকে পড়েছে একটা শহরে। গ্রোনব্ল। ডরোথীকে জানালাম মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আসছি। একেকটা জায়গায় বাস দাঁড়ায় আর আমি উৎসুক চোখে বাইরে তাকাই পরিচিত মুখটাকে খুঁজে পাব বলে। আমার সহযাত্রী তরুনীটি আমায় জানাল আমাদের শেষ গন্তব্য শহরের ট্রেন স্টেশন। স্টেশনে নেমে কাউকেই খুঁজে পেলামনা। না ফ্রঁসোয়া, না ডরোথী। ফোনও ঢুকছে না। একবার এদিকে যাই, আবার উলটোপথে হেঁটে আসি। হঠাৎ শুনলাম পেছন থেকে কে যেন চিৎকার করছে, " সুমাদহী, এ ও, সুমাদহী!" ঘুরতেই দেখি সেই দুষ্টুমিতে ভরপুর হাসিমাখা মুখ। না চেহারা একটুও বদলায়নি এ পাঁচ বছরে। শুধু ওজনটা কমে গেছে। স্বাভাবিক পাঁচ বছর আগের ছাত্রীটা এখন জাঁদরেল উকিল হয়ে গেছে যে। জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে বললাম," এক্সকিউজে-মোয়া মাদমোয়াজেল, নামটা সুমাদ্রী, তোমার ফরাসীটা উচ্চারণটা বড় কানে বাজে।" [ ফরাসীতে 'র' এর উচ্চারণটা বড় বিদঘুটে, 'হ' এবং 'খ' এর মাঝামাঝি একটা উচ্চারণ।]

 ডরোথীর বাসায় ব্যাগ রেখে বেরিয়ে পড়লাম। ফ্রঁসোয়া থাকে শহরের কেন্দ্রে।[ এরা বলে সন্তহ দ্য ভিল]। ওর বাসার ঠিক নীচেই কয়েকটা রেস্তোরাঁ। ফ্রান্সের রেস্তরাঁগুলোর বাইরে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে সাজানো থাকে চেয়ার টেবিল, সবাই গ্রীষ্মের মিষ্টি রোদ গায়ে মাখাতে চায়। আমি বাপু ছয় মাস আফ্রিকায় ঢের রোদ খেয়েছি। তাই টেরাসের যে জায়গাটায় একটু ছায়া আছে দেখলাম ওখানটাতে গিয়েই আমরা বসলাম। কিছুক্ষন পর ফ্রঁসোয়া আর ওর বান্ধবী নাতালি এসে যোগ দিল আমাদের সাথে। ফ্রঁসোয়া সাথে নিয়ে এসেছিল ফরাসী একটা ফল " প্রুন"। বেশ মিষ্টি স্বাদ। তারপর এই কথা, সেই কথা। কথার আর শেষ হয়না। একটার পর একটা টোস্ট চলতেই থাকল। ডরোথী আবার এলকোহলের ধারে কাছেও যাবেনা। ঘুরে ফিরে ও কী একটা ফলের রসই চাখছিল দেখলাম। গ্রীষ্মের এই এক মজা। সূর্য ডোবে রাত নটায়। রাত সাড়ে নটা পর্যন্ত আড্ডা মেরে অতঃপর উঠলাম। পরদিন সবাই আবার ভোরেই কাজে ছুটবে।

ফেরার পথে ডরো আমাকে শহরটা একটু ঘুরিয়ে আনল।

গ্রোনব্লে ছিলাম সবমিলিয়ে তিন দিন। ঘোরাঘুরি বলতে তেমন কিছুই হয়নি। আমার বন্ধুগুলো দিনের বেলা ভীষম ব্যস্ত। উকিল চলে যায় কোর্টে আর গলা ফাটিয়ে জজকে বলে, " আপনি এর বিচার করুন বিজ্ঞ বিচারক।" ফিজিওথেরাপিস্ট ফ্রঁসোয়া ক্লিনিকে রোগীদের ম্যাসাজ করতে করতেই কাহিল হয়ে গেল। আমি করি কী? দিনটা ইয়া লম্বা। গ্রোনব্লের যাদুঘরে গেলাম একদিন। ফ্রান্সের প্রতিটা শহরের যাদুঘরগুলো দেখার মত। পুরো দুনিয়ার ইতিহাসটাকে এরা নগরবাসীর জন্য, বিশেষ করে শিশুদের জন্য এনে হাজির করেছে এখানে। কী নেই এতে? মিশরের মমি থেকে শুরু করে মাতিসের ছবি। ডরো একটা ম্যাপ দিয়েছিল শহরের যাতে আমি পথ হারিয়ে না ফেলি। বেশ কাজ দিয়েছিল ওটি। শহরের প্রধান আকর্ষন ইজের নদীর ওপারে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শত বছরের পুরোনো দূর্গ বাস্তিই। দুভাবে ওখানটাতে যাওয়া যায়। পায়ে হেঁটে, ট্র্যাক করে। অথবা ক্যাপসুল ট্রামে চড়ে।  আমি কোনটা বেছে নেব ভাবতে ভাবতে আর ঠিক করতে পারলাম না। ইজের নামের ছোট্ট খরস্রোতা নদীটার পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজা দফিন-এর পার্লামেন্ট, এখন এটিও একটি যাদুঘরে রুপান্তরিত হয়েছে।
ইজের ব্রীজ।
সময় ফুরোতে চায়না। শহরের মাঝামাঝি একটা বড় পার্কে ঢুকে পড়লাম। এখানে ওখানে রোদ পোহাচ্ছে ছেলে-বুড়োর দল। প্রেমিক-প্রেমিকাদের চুম্বনালিঙ্গন দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেল। যেখানেই বসি সেখানেই দেখি এই ব্যাপার। একা একা সঙ্গীহীন বসে থাকাটা এখানে বড্ড অস্বস্তিকর। কোথাও আবার বাঘের মত বিশাল সাইজের কুকুর। আমার আবার কুকুরে একটু ইয়ে আছে! শান্তিতে তাই কোথাও বসার জো নেই। ঘুরঘুর করতে করতে বেগ পেয়ে গেল, কিন্তু উদ্দিষ্ট জায়গাটি খুঁজে পাচ্ছিনা। ব্যাপারটা ভুলে থাকার জন্য এক গীটার বাদকের কাছাকাছি বসে টুংটাং শুনছি, অমন সময় শুনলাম কারা যেন বলছে, " চল, জায়গাটা তোকে চিনিয়ে দিয়ে আসি।" মাথা ঘোরাতেই দেখি একটু পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দুই তরুন, আর যায় কোথায়! ছুটে গিয়ে ধরলাম। ওপারের। গ্রোনব্লে পড়াশোনা করছে। অনিকেত আর শ্বেতাভ। ওদের পিছু পিছু গিয়ে শান্তিনিকেতনের কাজ সেরে তিনজনে মিলে বসলাম ইজের এর ওপারের একটা ছোট রেস্তোরাঁয়। আর বাঙালী এক হলে যা হওয়ার তাই হতে লাগল।

দ্বিতীয়দিনও ডরো আমাকে ঘরের তালা চাবি দিয়ে কোর্টে চলে গেল। সারাদিন ঘরে আমি ভেরেন্ডা ভাজলাম। দুপুরে খাওয়ার জন্য ডরোর দুঘন্টার বিরতি। একটা রেস্তোরাঁয় বসে মজাসে একটা ফরাসী খাবার " হাবিওলা" খেলাম। ফরাসীদের খাবারের বেশ সুনাম শোনা যায়, কিন্তু আমার মসলামাখানো জিভ ওদের খাবারে কেন জানি কোন স্বাদই খুঁজে পায়না। ফরাসীরা অবশ্য খাবারের ব্যাপারে বেশ সৌখিন। প্রায় প্রতিটা শহরেই দেখেছি সারা পৃথিবীর রান্নাঘর। তবে অনেক খুঁজেও বাংলাদেশী কোন রেস্তোরাঁর হদিস পাইনি আমি কোথাও। ডরো চলে যাওয়ার পর আবার এদিক ওদিক ঘুরঘুর। শহরের ভেতরে ট্রাম চলে। ভাবলাম চেপে বসি। এমন সময় ফিজিওর ফোন, " তৈরী থেক, বিকেলে আল্পস পর্বত দেখাতে নিয়ে যাব।"

বিকেলে ফ্রঁসোয়ার সাথে এল ওর আরেক বন্ধু স্তেফানী। সাথে স্তেফানীর কুকুর লুনা। চারজনে মিলে আমরা স্তেফানীর ছোট্ট গাড়ীতে চেপে রওনা দিলাম। আমার পাশে লুনা। কিছু পরপরই কাঁইকুঁই করে গায়ে লুটিয়ে পরতে চায়। আমি একবার ধমকের মত করে বললাম, " এই কুত্তা!" ফ্রঁসোয়া বাংলাদেশে গেছে দুবার, কিন্তু এর মধ্যেই কুকুর আর কুত্তা'র মধ্যকার সূক্ষ পার্থক্যটা ভাল করেই বুঝে গেছে। আমার দিকে অভিমানী চোখ তুলে বলল," ওর নাম লুনা।" বাপরে!

পরের কয়েক ঘন্টা যেন স্বপ্নের ঘোরে ছিলাম।

গাড়িটা  পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। দুপাশে সব অপার্থিব দৃশ্য। ফ্রঁসোয়া জানাল এখানে সে শীতে স্কি করার জন্য ফি বছর আসে। জায়গাটা হাইকিং এর জন্যও বেশ নামকরা। অনেককেই দেখলাম সাইকেল চালিয়ে ঘাম ঝরাতে। কী দরকার বাবা অত কষ্ট করার, একটা গাড়ী নিয়ে শোঁ করে উঠে যাও। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা ড্রাইভ করে আমরা পাহাড়ের চূড়াটাকে দেখলাম। ও গড!
গাড়িটাকে একটা সরাইখানার পাশে রেখে আমরা এবার পায়ে হেঁটে উঠতে লাগলাম। এখানে এত উপরে রোদ থাকলেও আমার হাল্কা শীত লাগছিল। লুনার সাথে ইতিমধ্যে আমার বেশ ভাব জমে গেছে। ওকে এখন আর কুত্তা ডাকতে ইচ্ছে করেনা, আদর করে ডাক দিই লুউউউউনাআআআআ। ও ছুটে ছুটে আমাদের সামনে থাকছিল। ক্যাল্কের পাথরের পাহাড়। চারদিকে মিষ্টি সবুজ রঙ। পাহাড়ী ঘাসফুল হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। নাতালির বেশ কৌতূহল বাংলাদেশ নিয়ে। সেপ্টেম্বরে ওরা দুজন আবার যাবে চট্টগ্রাম। বললাম বান্দরবান, রাঙ্গামাটি,কক্সবাজার,সিলেট ঘুরে আসতে।

চূড়ামতন জায়গাটায় গিয়ে থামলাম আমরা। এখানেই একটা ছোটখাট পিকনিক করব। এতক্ষণ হাঁটার ফলে খিদেটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল।সাথে আনা কিশ, পিজ্জা, বার্গারগুলো তাই আমরা পরমানন্দে সাবাড় করতে লাগলাম। লুনার জন্যও আনা হয়েছে স্পেশাল খাবার। কিন্তু ইশ, পানি আনার কথা কারো মাথাই ছিলনা। কী আর করা কোক দিয়ে হাত ধুয়ে, মুখ মুছে হাসতে হাসতে খুন হবার উপক্রম আমাদের। বেশ কিছুক্ষণ ফুরফুরে বাতাস খেয়ে অন্য একটা পথা ধরে নামতে লাগলাম আমরা। নীচে একটা গোচারণভূমিতে অনেকগুলো গরু ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের গলায় ঘন্টা বাঁধা। তাদের বিচিত্র ঢং ঢং শব্দে পুরো পাহাড়টা মুখরিত। কী যে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল তখন। এই দৃশ্য কতবার আমি দেখেছি স্বপ্নে, টিভিতে।
এদিকে অসাবধান হয়ে চলতে চলতে ফ্রঁসোয়া মাড়িয়ে দিয়েছে গোবর। বিটকেল গরুগুলোর কোন স্যানিটারি সেন্স নেই, বলল সে। আমরা তো হাসতে হাসতে কাহিল। অবশেষে সরাইখানায় এসে একটা খালি টেবিলের দিকে আমরা এগিয়ে গেলাম। আমাদের মত আরও অনেকেই এসেছে এখানে গাড়ী নিয়ে।। বেচারী ডরোর জন্য সবাই একটু আফসোস করলাম। এমন সুন্দর বিকেল সে কিনা আসামী জেরা করে কাটিয়ে দিচ্ছে। অনেকক্ষণ আড্ডা মারার পর আকাশের রঙ যখন গোলাপী হতে শুরু করল ভাবলাম নামা যাক। পাহাড়টার দিকে আবার তাকালাম। শত হোক আল্পসের একটা প্রশাখা তো! দ্বিতীয়বার কি আর আসা হবে এখানে? হঠাৎ মনটা যেন একটু উদাস হয়ে গেল।

সে রাতে ডরোথীর বাসায় বাঙালী রান্নার আয়োজন করলাম। শেফ বিশিষ্ট এই অভাজন। ভোজন চলাকালীন এবং খাওয়ার পর ওদের চোখের পানি, নাকের পানি দেখে মনে হল কোথায় যেন একটা গন্ডগোল করে ফেলেছি আমি। হেঁশেলের কাজ কি আর যেন তেন কাজ!

তার পরদিনই গ্রোনব্লের মায়া কাটিয়ে লিওঁ ফিরে এলাম। ট্রেন থেকে অনেক দূর অব্দি দেখা যাচ্ছিল আল্পসের একটা অংশ।

শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১১

গজমোতির কূলে

















আফ্রিকার মাটিতে যখন প্রথম পা রাখি তখন মনে মনে বলেছিলাম, তোমায় প্রনতি জানাই আফ্রিকা, আমায় তোমাকে ভালবাসতে দাও।বাঁচিয়ে রেখো তোমার বুকে। তারপর আবেগের বশে লাইবেরিয়ার মনরোভিয়ার সেই রবার্ট বিমানবন্দরের কিছুটা মাটি যখন বুকে লাগিয়ে দেশের মাটির কথা ভাবছি,কয়েকজন সহকর্মী দেখি আড়চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।অতএব, নাটিকা আর এগুলো না।আমার কার্যক্ষেত্র যদিও গজমোতির কূল(আইভরি কোস্ট),যেখানে আমি জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষা মিশন এ কাজ করতে এসেছি, কিন্তু লাইবেরিয়াই আমায় প্রথম আফ্রিকার বাতাসের স্বাদ এনে দেয়,আর সে স্বাদ আমার পরিচিত নয়।বুনো,কড়া।কাছেই নাকি কোথাও বিখ্যাত একটা টায়ারের কারখানা আছে,বাঘ জাতীয় প্রাণীর গা থেকে ভেসে আসে যে গন্ধ এটা সেরকমই।প্রথমে তো ভেবেছিলাম আশেপাশেই বুঝি কোথাওবা ওতপেতে আছে সিংহের একটা পাল,আর ওই ভাবনা থেকে মনের এককোনায় একটু একটু ভয়ের ও আভাস পাচ্ছিলাম।শেষে ভয়কে জয় করে শ্বাপদের দলকে ধোঁকা দিয়ে আবার আকাশে ভেসে মেঘকেলি করে যখন আইভরি কোস্টের বুয়াকে নগরের বিমানবন্দরে নেমে দাঁড়ালাম তখন আফ্রিকার সূর্য তার সবটুকু তেজ দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছিল চারপাশ।ওফ, সে কি উত্তাপ!কিন্তু ব্যাপার কী,শিরদারা কিংবা কপাল বেয়ে কিছু গড়িয়ে পড়ছে না কেন?কেউ একজন বলল, আফ্রিকার বাতাসে আদ্রতা কম, তাই গরমে জ্বলে পুড়ে গেলেও ঘাম হবেনা তেমন। এ আবার কী জ্বালারে বাবা!এতদিন যা জেনে এসেছি তা দেখছি এখানে উল্টো।না জানি আরও কতকিছু অদ্ভুতুরে দেখব, জানব।এই দেখার নেশা,জানার তৃষ্ণাই তো আমাকে নিয়ে এসেছে এতদূরের দেশে যুদ্ধ যার সমৃদ্ধিকে ধুলায় পরিনত করেছে।বুয়াকে থেকে আবার উড়ে এলাম দেশের অন্য প্রান্তে।শহরের নাম ওদিএনে।শহর বললে আসলে ভুল হবে,আমাদের দেশের মফস্বল এলাকার মতই,গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে তার রুপ গেছে,এখন হাড় বের হয়ে আসা শরীর নিয়ে কোনমতে যেন বেঁচে আছে।তবে প্রকৃতি এখানে উদার।যেদিকে তাকাই শুধু দেখি বাগান আর বাগান, আর বাতাসে আম্রমুকুলের সুমিষ্ট গন্ধ।এখানে আসার আগেই নানামুখে শুনেছি এই আমগাছের প্রাচুর্য্যের কথা,এবার দেখে মন ভরে গেল।আর দেখলাম মাটি তার পাথুরে নুড়ি আর লাল রঙ নিয়ে সারাটা অঞ্চলজুড়ে ছড়ানো।ওদিয়েনে শহর ঘুরে যখন ক্যাম্প এ এলাম শরীরের রঙ তখন লাল।সারাটা পথের ধুলা আমাদের জামাকাপড়ের ওপর এমনভাবে রঙ ছিটিয়েছে যে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম।এখানে এসে গায়ের রংটা ও না আবার খোয়া যায়!ওদিয়েনে শহরে রাত্রিবাসের পর আবার যাত্রা করলাম আমার কর্মস্থল মঁ শহরের উদ্দেশ্যে, এবার আর শূন্যে নয়, সড়কপথে জীবন্ত আফ্রিকার ভেতর দিয়ে।ওদিয়েনে শহরের শত বছরের পুরনো বড় মসজিদ দেখলে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়।এখানে বলে রাখা ভাল,আইভরী কোস্টের উত্তর ভাগে প্রধানত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বাস, দক্ষিনে খ্রিস্টান ধর্মানুসারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।তাই ওদিয়েনে বা এরকম উত্তরের শহরগুলোতে যাওয়ার পথে অনেক সুদৃশ্য কারুকাজ করা মসজিদ চোখে পড়ে।সাড়ে পাঁচ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রায় রাস্তার দুধারে দেখলাম শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল।মাঝে মাঝে কিছু গ্রাম তাদের মাটির তৈরী গোলগোল বাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মানববসতির প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছিল।ছোটোবেলায় দেশ পত্রিকার ভেতরে অরন্যদেব এ দেখতাম এই ধরনের বাড়ি, এইবার নিজ চোখে দেখছি সব ভাবতেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়।তবে কালো মানুষগুলোর দারিদ্র্য দেখলে সব ভালোলাগার অনুভূতিগুলো করুণ হয়ে যায়।শতশত বছরের বঞ্চনার ইতিহাস বয়ে চলেছে এখানের মানুষ, এদের দেখে বোঝার উপায় নেই এ দেশে কত সম্পদ জমা হয়ে আছে আজও মাটির উপরে নীচে।আইভরি কোস্টের অর্থনীতি মূলতঃ কৃষিনির্ভর।বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোকো আর কফির উৎপাদন হয় এদেশে।আপনার প্রিয় চকোলেটটি কিন্তু প্রস্তুত হয় এই কোকো থেকেই।

মঁ শহর,যাকে আমরা এর ইংরেজী বানান MAN এর সাথে সংগতি রেখে বলি মান,তার উপকন্ঠে আমার অবস্থান।প্রথম দর্শনেই ভাল লেগে যাবার মত সুন্দর পাহাড়ী একটা জায়গা এই মঁ।চারদিকে বিশাল বিশাল পাথুরে পাহাড়,আর তাদের গায়ে চিরহরিৎ বন।অনেকটা আমাদের বান্দরবানের মতই।গৃহযুদ্ধের দামামা বাজার আগে এই শহর পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত ছিল বেশ বোঝা যায়,শহর জুড়ে থাকা বিভিন্ন হোটেলগুলো তারই প্রমাণ।একদিন আমরা দলবেঁধে গিয়েছিলাম এখানের সবচেয়ে ভাল হোটেল লা কাস্‌কাদ্‌ দেখতে।শহরের একটু বাইরে যে মনোরম ঝর্ণাটা আছে তারই নামে এর নাম।দীর্ঘকাল ফ্রান্সের উপনিবেশ থাকায় আইভরী কোস্টের সরকারী ভাষা ফরাসী যদিও এখানের ছেষট্টি নৃ-গোষ্ঠীর প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা রয়েছে।তাই এখানে রাস্তাঘাট,দোকানপাট,স্কুল কলেজ সবকিছুর নাম ফরাসী ভাষায় লেখা।আপনার ইংরেজী জ্ঞান এখানে কোন কাজেই আসবেনা কারণ সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম এখানে ফরাসী হওয়ায় শিক্ষিত লোকেদের মাঝে ও ইংরেজী জানা লোকের সংখ্যা হাতেগোনা।এই অধমের ভাষাটা কিঞ্চিৎ জানা থাকায় কার্যক্ষেত্রে বেশ সুবিধা লাভ করি, সহকর্মীরা ও তাই আমায় ছাড়তে চায়না, মায় মোবাইলের বার্তাটা ও আমাকে অনুবাদ করে দেওয়ার জন্য জেঁকে ধরে।মঁ শহরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে এই শহরের দাঁত।কী, চমকে গেলেন তো!আসলে এটা একটা পাহাড়ের দুমাথাওলা চুড়া,দেখলে মনে হবে একটা আক্কেল দাঁত শহরের মাঝখানে সদম্ভে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।প্যারিসের যেমন আইফেল টাওয়ার, এখানের তেমনি এই দাঁত।অধিবাসীরা খুবই আমুদে,হুল্লোড় ভালোবাসে, নিজেদের মধ্যে যখন ওরা আলাপ করে তখন আমাদের কাছে মনে হয় যেন ওরা ঝগড়া করছে।এখানে ছুটির দিন রবিবার,তাই শনিবার সন্ধ্যা থেকেই ওদের আর পাওয়া যায়না।রাস্তার দুপাশে ছড়ানো ছিটানো আছে অসংখ্য বার,যেগুলোকে ওরা বলে মাকি,সেখানে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয়ে যায় পানোসব,আর নৃত্য-গীত।একটা জনপ্রিয় বিয়ার এর নাম দিয়েছে এরা দ্রগবা।চেলসির এই খেলোয়াড় এদের জাতীয় বীর।এখানে দেখলাম পুরুষগুলো সব অকর্মার দল,এখানে ওখানে পড়ে থেকে কেবল আড্ডায় মশগুল আর মহিলারা দারুণ কর্মঠ,পিঠে কাপড় দিয়ে বিশেষ কায়দা করে বাচ্চাটাকে বেঁধে নিয়ে দিনরাত এরা খেটে যাচ্ছে।তবে একটা ব্যাপারে মহিলাদের তারিফ করতেই হয়, তা হল তাদের ফ্যাশন সচেতনতা,প্রায় অলিগলি সবখানেতেই রয়েছে বাহারি চুল কাটার দোকান,আর তাদের চুলের সেকি স্টাইল,ঘন কোকরানো চুলে বিচিত্র সব বিনি।ছেলেগুলো সব নোংরার হদ্দ,জামাকাপড় ময়লা,আদো স্নান করে কিনা কে জানে!আসলে এখানে পানির খুব অভাব,হতে পারে ওদের স্নানবিমুখতার এটা ও একটা অন্যতম কারণ।তবে আর যাই হোক,একটা ব্যাপারে আমাদের সবাইকেই এখানে অবাক হয়ে যেতে হয়,আর তা হল এখানের মানুষগুলোর সুস্বাস্থ্য।সুন্দর,সুঠাম,পেটানো শরীর এদের।রাস্তায় কখনো কোনো ভিখিরি বা পঙ্গু লোক দেখলাম না।সময় ও বোধহয় এখানে এসে থেমে গেছে কারণ বুড়ো লোকের দেখা মেলা এখানে বড়ই ভার। এ কদিনে বয়স্ক যত মানুষের সাথে কথা হয়েছে তাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন গ্রামের মোড়ল,এরা বলে শেফ দো ভিলায।মোড়লরা প্রায়ই বিশেষ এক আলখাল্লা পরে থাকে যার নাম বোবো। আফ্রিকায় আসার আগে জেনেছি এখানের মানুষেরা অস্থিচর্মসার,রোগেশোকে ভুগে কাহিল।এখানে এসে আইভরিয়ানদের দেখে নিজেকেই অসুস্থ মনে হয়।আসলে আইভরী কোস্ট পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দেশ।এদেশের প্রধান শহর আবিদজানকে আফ্রিকার প্যারিস বলা হয় এর নান্দনিক সৌন্দর্য আর ঐশ্বর্যের জন্য।শোনা যায় রাজনৈতিক অস্থিরতার আগে এখানের ধনকুবেরদের অনেকেই ফ্রান্সে প্রতি সপ্তাহে বেড়াতে যেত।রাজধানী ইয়ামাসুক্রুতে রয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গীর্জা বাসিলিকা যার সৌন্দর্য বর্নণার অতীত।তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে দক্ষিনের শহরগুলোর সাথে উত্তরের শহরগুলোর আকাশ-পাতাল তফাত। দক্ষিনের শহরগুলো এদেশের বানিজ্যকেন্দ্র হওয়ায় বেশ জমজমাট, বড় আর ভরপুর; উত্তরের শহরগুলো ছোট, মলিন আর কমঘনবসতিপুর্ণ।

মঁ শহরের কাছেই একটি ছোট্ট গ্রামে একদিন ঘুরতে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম।নাম তার রূপসী বাংলা।আপনিও অবাক হচ্ছেন? আসলে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী বাহিনী এখানে একটা সুন্দর মসজিদ তৈরী করে তার নাম রেখেছিল রূপসী বাংলা আর সে নাম থেকেই এ গ্রামের নতুন এই নাম।যদিও স্থানীয়রা একে এর পুরোনো নাম পোতি বিয়াপ্লো ডাকতেই ভালোবাসে।বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের কার্যকলাপ বরাবরের মতই এখানে প্রশংসনীয়।বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান, প্রত্যন্ত গ্রামে টিউবওয়েল স্থাপন, বস্ত্র ও খাবার বিতরণ ইত্যাদি মানবিক সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশীদের আইভরিয়ানরা ভালোবাসে।পশ্চিমদিকের শহর দানানেতে যাওয়ার পথে তাই চোখে পড়ে এই ভালোবাসার নিদর্শণ,বাংলাদেশ রোড।প্রায়ঃশই এখানে ওখানে যাওয়ার সময় দেখি লোকজন হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানায়, অনেকে বাংলায় বলে উঠে, হেই বাংলা,ভালো আছো? আর বাচ্চারা সবখানেই ছুটে এসে হাত বাড়িয়ে দেই, বলে, বিস্কিই,বিস্কিই মানে বিস্কুট।এদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার হল এই বিস্কুট।আইভরিয়ানদের প্রধান একটা খাবার হল কাসাভা,ওরা বলে ইয়ামক।এটা আসলে একধরনের মেটে আলু যেটাকে ফালি ফালি করে কেটে,রোদে শুকিয়ে নিয়ে,তারপর গুড়ো করে ওরা তা দিয়ে হরেক রকমের খাবার তৈরী করে।একদিন এক গ্রামে একটুখানি চেখে দেখেছিলাম,খুব একটা সুস্বাদু বলবনা।পূবদিকের শহর দালোয়া যাওয়ার পথে পড়ে নয়নাভিরাম সাসান্দ্রা হ্রদ,মঁ বা আশেপাশের অন্য শহরগুলোর বাজারগুলোর সমস্ত মাছই কমবেশী এই হ্রদ থেকেই আসে।আমাদের দেশের কোরাল মাছকে এরা বলে কাপিতেন(ক্যাপ্টেন)মাছ, আর পাওয়া যায় তেলাপিয়া,এক একটা রুই মাছের মত বড়।সাসান্দ্রার স্বচ্ছ নীল জল আর হ্রদ জুড়ে থাকা বড় বড় গাছের অবশেষ আমাকে রাংগামাটি লেকের কথা মনে করিয়ে দেয় বারবার।

আইভরী কোস্ট-ই আমার কাছে প্রথম আফ্রিকার রূপ মেলে ধরলেও,এর লাল পাথুরে মাটি,কালো কালো মানুষ,বিশাল ইরোকো,পাম আর ফ্রাকে গাছের ঘন জঙ্গল,ইতিউতি দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ী গ্রাম,বাঁশঝাড়,ধানক্ষেত এসবকিছু আমার মাঝে একটাই অনুভূতির জন্ম দেয়-এই বিশাল বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে আমরা সকলেই আসলে এক অদ্ভুত আত্মীয়তায় বাঁধা,পুরো পৃথিবীই আসলে আমাদের বাসভূমি।