গতরাতে বৃষ্টি হল পাগলের প্রলাপের মত অবিশ্রান্ত।আফ্রিকার আকাশ বাংলার আকাশের
মত সুনীল হলে কি হবে,এর অভিধানে অভিমান শব্দটি নেই।তাই এখানের
বৃষ্টি দেখে একবার ও মনে হয়না আকাশের আজ মন খারাপ। মনে আছে যখন আসি এখানে তখন এক কাল
বন্ধুকে বেশ গর্বভরে বলেছিলাম আমি বর্ষার দেশের মানুষ। বৃষ্টির জল আমাদের হৃদয়ের ভাষা
বোঝে।কি জানি কি ভেবে বন্ধুটি আমার হেসে বলেছিল আফ্রিকার বর্ষা অতোটা রোমান্টিক নয়।এখানের
প্রকৃতির সাথে আমাদের শ্যামলিমার অনেক মিল থাকলেও বৃষ্টি-প্রেমের অতীব গুরুত্বপূর্ণ
অনুষঙ্গ কদম ফুলের গাছ কোথাও চোখে পড়লনা এ কমাসে।আহা কদম ফুল!পৃথিবীতে অমন সুন্দর ফুল
কটি ফোটে বর্ষাকালে।মনে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে
চারপাশের পাহাড় থেকে যখন ভেসে আসত বুনো কদমের মায়াবী গন্ধ তখন জন কীটস পড়াতে আসা শিক্ষকটি
ও হঠাৎ যক্ষের মত বিরহী হয়ে উঠতেন।পৃথিবীর অন্য ভাষায় বর্ষাবন্দনা অমন করে কি হয়েছে
কোনকালে?
রাতে বৃষ্টি হলে তারপরদিন সকালে ক্যাম্পের সামনের পাহাড়ে নেমে আসে মেঘের দল।সে
এক অপূর্ব,অপার্থিব দৃশ্য।যেন মনে হয় পাহাড়গুলোকে সান্ত্বনা
দিতে আসে ওরা,কিংবা অন্য আকাশের অন্য পৃথিবীর গল্প,ঘ্রাণ নিয়ে আসে ওদের কাছে।এই যে পাহাড়গুলো কার অভিশাপে কত হাজার
বছর ধরে মাটির সাথে আটকে পড়ে আছে কে জানে,তাদের জন্য
ভারী মায়া হয় মাঝে মাঝে।প্রখর রোদে তারা জ্বলে পুড়ে যায়,দূর্দান্ত হাওয়া তাদের শরীর ছিঁড়ে দেয় আর বৃষ্টির প্রচন্ডতার মাঝে তারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে
থেকে বিদ্যুতের নকশা দেখে আকাশে।লাবণ্য শব্দটা ঠিক মানায়না এ বর্ষার জন্য।যখন আসি এ
দেশে তখন মাঝে মাঝে আকাশে আসতেন 'হারমাটান'।লাল ধূলায় আকাশ ঢেকে ফেলে দানবের মত হুংকার ছাড়তে ছাড়তে তিনি
ছুটে যেতেন গ্রাম,শহর আর সাভানার ওপর।আচেবির গল্পে পড়েছি পঙ্গপালের
ঝাঁকের আকাশ ঢেকে ফেলার কথা।হারমাটানের কবলে পড়লে আমাদের নাক দিয়ে রক্ত ঝরত,তাই পরবর্তীতে যখনই আকাশে লাল ধূলোর মেঘ দেখতাম আমি ভোঁ দৌঁড়
দিয়ে ফিরে আসতাম আমার রুমে,তারপর ঝড় থেমে গেলে
খোঁজ নিতাম কার নাক দিয়ে কতটুকু রক্ত ঝরল।
বাংলার বৃষ্টির সাথে অদৃশ্য নুপুরপরা অপ্সরারা
নাচে।কান পাতলেই শোনা যায় ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম।গ্রামে টিনের চালে একটা মধুর শব্দ হত,ঝোপ থেকে,ডোবা থেকে অবিরত ব্যাঙেরা
প্রণয়গীত গেয়ে যেত।আমরা তখন মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে এক দৌঁড়ে উঠোন পেরিয়ে চলে যেতাম
আম বাগানে,তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে কাঁপতে কাঁপতে ফিরে
আসতাম ঘরে দুপকেট ভরে কাঁচা আম নিয়ে।কখনো কখনো শিলাবৃষ্টি হলে মা বলতেন, আকাশের ওপারে যে দুষ্টু ছেলেদের দল আছে তারা আমাদের হিংসে করে
বরফের ঢিল ছুঁড়ে মারছে।তখন ভেবে কূল পেতামনা ওই সব দুষ্টু ছেলেদের সাথে আমাদের কিসের
শত্রুতা।মায়ের কোলে শুয়ে শুয়ে শুনতাম,
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।
এরকম বর্ষামেদুর দিনে কখনো স্কুলে যেতে না
হলে,ঘরে বাবা থাকলে আমি দোতলার একলা ঘরে গিয়ে চুপিচুপি আকাশ দেখতাম
আর ওপারের দুষ্টু ছেলেদের খুঁজে বেড়াতাম। তখন চোখে পড়ত রজনী জেঠা মাথায় জোঁইর চাপিয়ে
বিলের কিনারে ঘাস কাটছেন, ওপাড়ার নীলু ইয়া বড়
কচুপাতাকে ছাতা বানিয়ে মাথার ওপর ধরে ঘরে ফিরছে,আর চারদিকে সেই অমোঘ সংগীত।ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম ঝুম। এ সুর বহুদূরের ওপার থেকে ভেসে
আসা সুর।
এখানের বৃষ্টি যেন হুংকার ছাড়ে,আমার প্রিফ্যাবের ছাদে দুমদাম কিল বসায়।ভেকেদের গীতে প্রণয়ের
লেশমাত্র ও নেই।আমি খুব আশা করে বসে থাকি কোথাও বাজবে মেঘ রাগ কিংবা রবীন্দ্রনাথের
গান।বৃষ্টিতে ভেসে আসে বৃশ্চিক আর সাপ।আতঙ্কে আমরা রুমে নিজেদের বন্দী করে রাখি।আমাদের
পোষা হরিণ দুটো মায়াময় চোখে ভিজে যেতে থাকে।জলের তোড় মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে যেতে
একটা ধারা তৈরী করলে আমার কাগজ দিয়ে নৌকা বানাতে খুব ইচ্ছে করে।ছোটবেলায় এভাবে আমি
পাড়ি দিতাম সাগর-মহাসাগর।জানিনা কোন অদ্ভুত কারনে বৃষ্টি এলেই শৈশবটা স্মৃতি থেকে লাফিয়ে
পড়তে চায় যৌবনের আঙিনায়।
গতকাল সারাটা রাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হল।এটা
বর্ষাকাল শুরুর পূর্বাভাষ।এ ঋতুতে এখানে আকাশ ভেঙে ভেঙে পড়ে।কখনো কখনো টানা এক সপ্তাহ।সকালে
দেখলাম মেঘগুলো নেমে এসেছে পাহাড়ের কোলে।হয়তো নতুন কোন পৃথিবীর নতুন কোন গল্প নিয়ে।আমার
খুব শুনতে ইচ্ছে করে মেঘ রাগ কিংবা মায়ের কন্ঠ-
নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে
ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন